শুক্রবার ৬ মে জাফলংয়ে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। ছবি: মনজুর আহমদ

মনজুর আহমদ, গোয়াইনঘাট : ঈদের ছুটিতে আনন্দ ভ্রমণে প্রাকৃতিক সোন্দৌর্যের অপরূপ লীলাভূমি গোয়াইনঘাটের জাফলং, বিছনাকান্দি, রাতারগুল ও পান্তুমাই মায়াবী ঝর্ণা দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের আগমনে পর্যটন কেন্দ্রগুলোয় উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। গত কয়েক বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে বেশি পর্যটক এসেছেন গোয়াইনঘাট পর্যটন কেন্দ্রগুলোয়।

প্রকৃতিকন্যা জাফলং একবার অবলোকন করতে কার না মন চায়। তাই এবারের ঈদ-উল ফিতরের দিন থেকে শুরু করে শুক্রবার ৬ মে পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীদের মিলন মেলা ঘটে জাফলংয়ে।

ঈদ উপলক্ষে জাফলংয়ের পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা নতুন সাজে সাজিয়ে রাখে জাফলংকে। পুলিশ প্রশাসন নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখতে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয় প্রত্যেকটি পর্যটন কেন্দ্রে।

পর্যটকরা সিলেট নগরী থেকে বিভিন্ন যানবাহন নিয়ে সিলেট তামাবিল মহাসড়ক দিয়ে রওয়ানা দেয় জাফলংয়ের উদ্দেশ্যে।

যাওয়ার পথে মিলে হযরত শাহপরান রহঃ এর মাজার, একটু সামনে গেলে দেখা যায় বটেশ্বর ক্যাটেন্টমেন্ট, তার পর সিলেট গ্যাস ফিল্ড, পাশে রয়েছে উতলারপার, যেখানে পাহাড় ও পানির কূপে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। সড়কের দু’পাশে সারি সারি বৃক্ষরাজী মনকে আলাদাভাবে ভাবিয়ে তোলে। হরিপুর অতিক্রম করলে মিলে রাস্তার দু’দিকে বিশাল হাওর, যেখানে হিজল আর করচ গাছের পাতা পর্যটকদের হাতছানি দিতে থাকে। তখন পর্টকরা অজানার উদ্দেশ্যে হারিয়ে যায়।

খনিকটা সামনে এগোলে দেখা যায় নীলনদ খ্যাত সারীনদী। আর এই সারীনদীর পানির রং দেখে অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেননি এসব পানি না অন্যকিছু।

কিছ পথ অতিক্রমেই মিলে রাস্তার মধ্যখানে জৈন্তিয়া রাজার ধর্মশালা।

এবার দৃষ্টিতে পড়ে মেঘালয় পাহাড় বেষ্টিত দেওয়াল, মনে হয় দেশের সীমান্ত পাহাড় দিয়ে দেয়াল তৈরী। জৈন্তাপুর উপজেলা সদরে জৈন্তিয়া রাজার রাজপ্রসাদসহ রয়েছে অনেক পুরানো স্মৃতি আর ঐতিহ্য। সদর অতিক্রম করে দেখা যায় ডিবির হাওরে অবস্থিত লাল শাপলার বিল।

এবার চোখে পড়ে শ্রীপুর চা-বাগান। বাগানের মাঝে রয়েছে জাফলং ভেলী বোর্ডিং স্কুল।

এবার গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তে নলজুরী এলাকায় প্রবেশ। উত্তর আকাশে চোখ মেললেই ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্না আপনাকে প্রকৃতির হাত দিয়ে হাতছানি দিচ্ছে। সেই নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সোন্দৌর্য পর্যটকদের প্রেমে পড়ে মন কিনে নেয়। যেতে যেতে মিলে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর তামাবিল জিরো পয়েন্ট।

তামাবিল জিরো পয়েন্ট অতিক্রম করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে মনে হবে পার্বত্য অঞ্চল। আকাবাকা ও উঁচু-নীচু সড়ক। দু’পাশে জাফলং বন বিভাগের সাজানো বৃক্ষরাজী। ময়না, কোকিল, সারী, ঘুঘু, মাছরাঙাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কিচিরমিচির শব্দ। তখন পর্যটকরা প্রকৃতির প্রেমের আলিঙ্গনে মিছে যায়।

সড়কের ডানপাশে বিজিবি ক্যাম্প’র রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করে। গাড়ি পার্কিং করে এবার পায়ে হেঁটে জেলা পরিষদ কর্তৃক নির্মিত সুবিশাল সিঁড়ি দিয়ে পৌঁছে যান প্রকৃতি কন্যা জাফলং জিরো পয়েন্টে। যেখানে ডাউকি নদীর মোহনা।

সীমান্তের এইপারে বাংলাদেশী পর্যটক আর ওপারে ভারতীয় পর্যটকের এ যেন আরেক মিলন মেলা।

একটু সামনে পিয়াইনের তীরে ভারতীয় পাহাড়ঘেঁষা মায়বী ঝর্না আর পিয়াইনের দক্ষিণ পারে আদিবাসী খাসিয়া পল্লী। এসবে হাজার পর্যটকের ভিড়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কে কোথায় হারিয়ে যায়। ডাউকি নদীর তীরে অবস্থিত এশিয়ার সেরা সমতল জাফলং চা-বাগান। সেখানেও পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়।

পর্যটকদের ভিড় লক্ষ্য করা যায় বিছনাকান্দি, রাতারগুল সোয়াম ফরেস্ট ও পান্তুমাই ঝর্নাতে। সব মিলিয়ে গোয়াইনঘাটে সবগুলো পর্যটন কেন্দ্র, রাস্তাঘাট আর হাট-বাজার লোকে লোকারণ্য।

কক্সবাজার থেকে আসা নবদম্পতি সোহাগ ও মনি জানান, আমাদের কক্সবাজারে দেশী-বিদেশি পর্যটকরা আসে আমরা বরণ করি। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল জাফলং বেড়ানোর। এবার ঈদ উপলক্ষে আমরা দু’জন আসলাম এবং খুব ভাল লাগছে।

ঢাকার মতিঝিল থেকে আসা স্কুল শিক্ষিকা মুনতাহা বলেন, রাতারগুল সোয়াম ফরেস্ট এলাকা ঘুরে দেখে মনে হচ্ছে ২য় সুন্দরবন।

ঢাবি ইংরেজি বিভাগের ছাত্র মুনতাসীর মামুন জানান, রাতারগুল ও বিছনাকান্দি ঘুরে দেখে মনে অনেক আনন্দ পাইলাম।

ওসি গোয়াইনঘাট কেএম নজরুল ইসলাম জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।

সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন পিপিএম এই প্রতিবেদককে জানান, জাফলংয়ের ঘটনায় আমরা হামলায় জড়িতদের গ্রেফতার করেছি এবং সংশ্লিষ্ট কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। সবগুলো পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করণে অতিরিক্ত পুলিশ প্রেরণ করেছি। বর্তমানসহ ভবিষ্যতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।