গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি : গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয় সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক এমএ মান্নানের নামাজে জানাজায় মানুষের ঢল নামে।

শুক্রবার বাদ জোহর নগরীর শহিদ বরকত স্টেডিয়ামে ও বাদ আসর সালনায় নাসির উদ্দিন মেমোরিয়াল স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত জানাযায় লাখো মানুষ মানুষ শরিক হন।

এদিকে অধ্যাপক এমএ মান্নানের মৃত্যুতে তিনদিনের শোক ঘোষণা করেছে গাজীপুর মহানগর বিএনপি। এ তিনদিন দলীয় কার্যালয়ের সামনে দলীয় পতাকা অর্ধনমিত এবং প্রতিদিন কুরআনখানি, দোয়া ও ইফতারের আয়োজন থাকছে। গাজীপুর মহানগর বিএনপির আহবায়ক সালাহ উদ্দিন সরকার এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

জানাযায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন সবুজ এমপি, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসান উদ্দিন সরকার, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান, সাবেক সচিব এম.এম নিয়াজ উদ্দিন, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ডা. মাজহারুল আলম, মহানগর বিএনপির আহবায়ক সালাহ উদ্দিন সরকার, যুগ্ম আহবায়ক শওকত হোসেন সরকার, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ রিয়াজুল হান্নানসহ বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ সর্বস্তরের মানুষ শরিক হন।

জানাযা শেষে মরহুমের স্থানীয় কাউলতিয়ার বাড়ির কাছে পারিবারিক কবরস্থানে পিতা-মাতা ও স্ত্রীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

উল্লেখ্য, অধ্যাপক এমএ মান্নান বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকায় ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে ডায়াবেটিক, কিডনীসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি এক ছেলেসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, দলীয় নেতাকর্মী, অনুসারী ও গুনগ্রাহী রেখে গেছেন।

অধ্যাপক এমএ মান্নান ২০১৩ সালের ৬ জুলাই গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। পরে ২০১৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বারিধারার বাসভবন থেকে পুলিশ তাকে নাশকতার একটি মামলায় গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় ওই বছর ১৯ আগস্ট স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয় তাকে মেয়র পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে। তার বিরুদ্ধে নাশকতা, গাড়ি পোড়ানোসহ বিভিন্ন ধারায় প্রায় ৩০টি মামলা দেওয়া হয়। তিনি তার ৫ বছরের মেয়র মেয়াদকালে ২৮ মাস কারাগারে আটক ছিলেন।

তিনি সালনা প্রাইমারি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন জয়দেবপুর রানী বিলাসমণি স্কুলে। সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণি পড়েন ময়মনসিংহ মুসলিম হাই স্কুলে। এরপর নবম ও দশম শ্রেণি ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে পড়ে এসএসসি পাস করেন। কলেজ জীবনের এইচএসসি ও ডিগ্রি পাস করেন ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে।

এভাবেই ময়মনসিংহে নানার বাড়ি থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত রসায়নে এমএসসিতে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন শেষে টঙ্গী সরকারি কলেজে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তখন থেকেই শিক্ষকতার পাশাপাশি রাজনীতি ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে সক্রিয় রেখেছেন। টঙ্গী কলেজ ছেড়ে পরে তিনি গাজীপুর কাজী আজিম উদ্দিন কলেজে যোগদান করেন।

রাজনীতি : দীর্ঘ বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে তিনি দলের সদস্য থেকে শুরু করে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং বর্তমানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। মান্নানের রাজনৈতিক উত্থান শুরু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থেকে। অবশ্য এর আগে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে দলীয়ভাবে সালনা গ্রাম সরকার প্রধানের দায়িত্ব পান তিনি। পরে জাতীয় গ্রাম সরকারের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিবেরও দায়িত্বে ছিলেন। অধ্যাপক মান্নান প্রথম’ ৮৪ সালে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে কাউলতিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরে আরও পরপর চার বার তিনি ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচন করে বিজয়ী হন।

তিনি ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-২ (গাজীপুর সদর ও টঙ্গী) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দেশের সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়ে এম এ মান্নান বিএনপি সরকারের ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে।

২০১৩ সালে তিনি গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নাশকতা, গাড়িপোগানোসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে প্রায় ৩০টি মামলা দেওয়া হয়। তার ৫ বছর মেয়াদকালে তিনি প্রায় ২৯ মাস কারাগারে ছিলেন। এর আগে অসুস্থ অবস্থায়ই তাকে একাধিকবার রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন ও হয়রাণী করা হয়। মামলার অজুহাতে তাকে মেয়রের পদ থেকেও বহিষ্কার করা হয়। মেয়রের ভারপ্রাপত দায়িত্ব দেয়া হয় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণকে।