হুন্ডির মাধ্যমে অনলাইন জুয়ারীদের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার

গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি : অনলাইন জুয়ারী চক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে গাজীপুর মহানগর পুলিশ। এ চক্রের সদস্যরা অনলাইনে জুয়া খেলে হন্ডির মাধ্যমে বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচার করে আসছে। চক্রটি নভেম্বর মাসেই ৩ হাজার কোটি টাকার অধিক লেনদেন করেছে। বৃহস্পতিবার এক প্রেসব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান জিএমপি কমিশনার মোল্লা নজরুল ইসলাম।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন, নাসির মৃধা (৩০), মারুফ হাসান (২৪), জাহিদুল ইসলাম ওরফে রসুল (২২), আশিকুর রহমান আশিক (২৭), কাউসার হোসেন (২৩), রুবেল হোসেন (২৫), আশিকুল হক (২৫), আকরাম হোসেন রিপন (২৬) ও মুরাদ হাসান (২৫)।

জিএমপি সদর দপ্তরে আয়োজিত এ প্রেসব্রিফিংয়ে জিএমপি অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, জিয়াউল হক, উপকমিশনার আবু তোরাব মো. শামসুর রহমান, মোহাম্মদ ইলতুৎমিশ, মো. হুমায়ুন কবির প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. আলমগীর হোসেন জানান , গ্রেফতারকৃতদের জব্দকৃত মোবাইল, বিকাশ, রকেট, ব্যাংক হিসাব সূত্রে এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, বাংলাদেশে অবৈধ অনলাইন জুয়ার প্লাটফর্ম velki live (সাবেক নাম 9Wickets) ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসে ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে Google chorme ব্রাউজার ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজের উঠতি বয়সের যুবকদের আসক্ত করে বিদেশে পাচার করে নেয়া হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা।

তারা মালোয়েশিয়া অথবা দুবাই এর মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে WhatsApp Business Account খুলে নিজেদের প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে যোগাযোগ করে থাকে। এই সার্ভারটি প্রধানত নিয়ন্ত্রণ করে থাকে velki live এর এ্যাডমিন আকাশ মালিক ওরফে রনি (বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত দুবাই প্রবাসী)। তিনি এটিকে ওয়েব সাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন বিদেশী নাম্বার ব্যবহার করে সারা বাংলাদেশের ৫টি লেয়ারে তথা এ্যাডমিন, সাইট সাব এ্যাডমিন, সুপার এজেন্ট, মাস্টার এজেন্ট ও ইউজার (রুট লেভেলের ব্যবহারকারী) লেয়ারে বিভক্ত করে। প্রতিটি লেয়ার তার উপরের লেয়ারের মাধ্যমে কার্যক্রম সম্পাদন করে থাকে। তার মধ্যে একজন রুট লেবেলের আগ্রহী অনলাইন জুয়ারী https://allagentlist.com/ad.php প্রবেশ করে ক্লিক করলেই এক হাজার টাকার বিপরীতে ১০টি ডিজিটাল কয়েন প্রদান করে অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়া হয়।

এই ডিজিটাল কয়েন লেনদেন মুলত সারা বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেট, ফুটবললীগ, টেনিস এবং বর্তমানে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার মাধ্যমেও প্রধানত অনলাইনে জুয়া খেলা হয়। ব্যবহারকারী জয়ী হলে ডিজিটাল কয়েন ফেরত নিয়ে এর বিপরীতে আর্থিক লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করে থাকে। হারলে তার পুরো ডিজিটাল কয়েনটাই পর্যায়ক্রমে জুয়া পরিচালনাকারীর কাছে জমা হয়ে যায়। উক্ত velki.live এর সাইটে ১ জন এ্যাডমিন, ১৪ জন সাইট সাবএ্যাডমিন, ২৪০ জন সুপার এজেন্ট, ১৫০০ এর অধিক মাস্টার এজেন্ট এবং সারা দেশে প্রায় দুই লক্ষাধিক ইউজার রয়েছে বলে জানা যায়।

জিএমপি’র এ কর্মকর্তা আরো জানান, জিএমপি সদর থানা কর্তৃক প্রথমে মাস্টার এজেন্ট নাসির গ্রেফতার হলে তার দেওয়া তথ্য, ব্যবহৃত মোবাইলের মেসেঞ্জার, হোয়টাসএ্যাপ চ্যাটিং ও এমএফএস (বিকাশ/নগদ/রকেট) যাচাই করে দেখা যায়, তার নিকট রুট লেবেলের প্রায় ৭০ জন ব্যবহারকারীর নিকট থেকে দৈনিক লক্ষাধিক টাকা সংগ্রহ করে তার ঊর্ধ্বতন সুপার এজেন্ট মারুফের নিকট প্রদান করে।

মারুফকে গ্রেফতারের জন্য উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হলে সাথে অপর ৭ জনেরও জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়ে গ্রেফতার করা হয়। তাদের ব্যবহৃত মোবাইল, মেসেঞ্জার, হোয়টাসএ্যাপ চ্যাটিং ও এমএফএস (বিকাশ/নগদ/রকেট) যাচাই করে দেখা যায়, সে তার উর্ধ্বতন সাইট সাবএ্যাডমিন হককে (ওয়েবসাইট নেম) একটি ডাচ বাংলা ব্যাংক এর এজেন্ট ব্যাংকের ১৪৮টি একাউন্টে গত নভেম্বর মাসে ২ কোটি টাকার অধিক লেনদেন করেছে। এ হিসেবে বাংলাদেশে প্রায় ১৫০০টি মাস্টার এজেন্টের মাধ্যমে এক মাসেই ৩ হাজার কোটি টাকার অধিক লেনদেন হয়েছে বলে প্রতিয়মান হয়। যা বাংলাদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। ফলে দেশ হতে পাচার হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

এ সংক্রান্তে সদর থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা এবং সিআইডি কর্তৃক মানি লন্ডারিং আইনে মামলা গ্রহণের ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে প্রেসব্রিফিংয়ে জানানো হয়।