শেখ আজিজুল হক, গাজীপুর মহানগর : গাজীপুরে আবাসিক হোটেল থেকে ড্রামভর্তি অজ্ঞাত মহিলার লাশ উদ্ধারের ৪ বছর ৩ মাস পর রহস্য উদঘাটন করলো পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন- পিবিআই। তবে ওই লাশের নামপরিচয় এখনো অজ্ঞাতই রয়ে গেছে।

হোটেল কর্মচারীদের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে রাজি না হওয়ায় হত্যাকান্ডের শিকার হন ওই হতভাগা নারী। এ ঘটনায় হোতাপাড়ার বৈশাখী আবাসিক হোটেলের সাবেক ৩ কর্মচারীকে গ্রেফতার করেছে পিবিআই। আসামীরা এ হত্যাকান্ডে কে, কী ভূমিকায় ছিলো আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে প্রকাশ করেছে।

গ্রেফতারকৃতরা হলো, ময়মনসিংহ জেলার গৌরিপুর থানার পালোহাটি গ্রামের আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে জিয়াউর রহমান ওরফে সুমন (৪৫)। তাকে গত মঙ্গলবার রাত পৌনে ২টায় ময়মনসিংহ শহরের মাসকান্দা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। অপর আসামী আমির হোসেন ফকির (৩৩) মুন্সিগঞ্জ জেলার টংগীবাড়ী থানার রাউৎভোগ গ্রামের আয়নাল ফকিরের ছেলে। তাকে গ্রামের বাড়ি থেকে একই দিন রাত দেড়টায় গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত কামরুল হাসান সবুজ (৩৮) ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার আমিরাবাড়ি গ্রামের মৃত ইয়াসিন আলীর ছেলে। তাকে একই দিন রাত ৪টায় মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান থানাধীন মালখানাগর চৌরাস্তা এলাকার ভাড়া বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে পিবিআই।

পিবিআই পুলিশ জানায়, হতভাগা ওই নারীকে আবাসিক হোটেলে আটকে রেখে অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হতো। হোটেল কর্মচারীদের কুপ্রস্তাবে রাজি না হয়ে বরং প্রতিবাদ করায় গলাচিপে হত্যা করা হয় তাকে। এর পর লাশটি ড্রামে ভরে হোটেলের পেছনের খালি জায়গায় মাটিতে পুঁতে রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সেখানে লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে লাশভর্তি ড্রামটি হোটেলের নিচ তলায় জেনারেটর রুমে রেখে পালিয়ে যায় ঘাতকরা।

স্থানীয় হোতাপাড়া ফাঁড়ি পুলিশ সংবাদ পেয়ে গত ২০১৮ সালের ১৯ এপ্রিল সেখান থেকে অজ্ঞাতনামা ওই মহিলার (বয়স আনুমানিক ২৫ বছর) লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। এ ঘটনায় সাবেক হোতাপাড়া ফাঁড়ির এসআই রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে জয়দেবপুর থানায় মামলা রুজু করেন।

জয়দেবপুর থানা পুলিশ মামলাটি প্রায় ৩ বছর তদন্ত করে রহস্য উদঘাটন করতে না পেরে আদালতে চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। পরে আদালত স্বপ্রনোদিত হয়ে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআই গাজীপুর জেলাকে নির্দেশ দেন।

পিবিআই প্রধান অ্যাডিশনাল আইজিপি বনজ কুমার মজুমদারের তত্ত্বাবধান ও দিক নির্দেশনায় পিবিআই গাজীপুর ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাকছুদের রহমানের সহযোগিতায় মামলাটি তদন্ত করেন উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) মো. জামাল উদ্দিন। তিনি তথ্য প্রযুক্তি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে উক্ত মামলার রহস্য উদঘাটন করেন।

তবে হত্যাকান্ডের শিকার হতভাগা ওই অজ্ঞাত মহিলার নাম পরিচয় এখনো উদঘাটন করতে পারেননি। এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্রেফতারকৃত আসামীরা একজনের নাম বলেছেন, যার মাধ্যমে ওই নারীকে উক্ত হোটেলে আনা হয়েছিলো। আমরা ওই সূত্র ধরে এ অজ্ঞাত লাশের পরিচয় সনাক্তের চেষ্টা করছি।

আসামীদের জবানবন্দির বরাদ দিয়ে গাজীপুর পিবিআই পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাকছুদের রহমান জানান, হোতাপাড়াস্থ বৈশাখী আবাসিক হোটেলে বিভিন্ন মেয়েদেরকে এনে অনৈতিক কাজে ব্যবহার করত।

গ্রেফতারকৃত আসামী জিয়াউর রহমান ওরফে সুমন, আমির হোসেন ও কামরুল হাসান সবুজ এবং তাদের অন্যান্য সহযোগী ঘটনার দিন অজ্ঞাতনামা ওই মহিলা ভিকটিমকে উক্ত হোটেলের ২০৪ নম্বর রুমে রেখে বিভিন্ন খদ্দের দিয়ে অনৈতিক সম্পর্ক করায়। পরবর্তীতে রাত অনুমান ১০টায় গ্রেফতারকৃত আসামীরাসহ তাদের সহযোগীরা মেয়েটির সাথে অনৈতিক সম্পর্ক করার প্রস্তাব করলে মেয়েটি প্রত্যাখান করে।

আসামীরা একপর্যায়ে মেয়েটির সাথে জোরপূর্বক অনৈতিক সম্পর্ক করার চেষ্টা করলে মেয়েটি বাধা প্রদান করে। এরপর আসামীরা মেয়েটিকে উক্ত হোটেলের ২০৪ নম্বর রুমে খাটের উপরে গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশটি খাটের নিচে রেখে দেয়।

এ সময় আসামীরা উক্ত আবাসিক হোটেলের মালিক ইকবাল হোসেনকে (৩৫) ফোনে ঘটনাটি জানায়। পরে ইকবালের পরামর্শে আসামীরা লাশটি একটি ড্রামের ভেতর ভরে হোটেলের পেছনে খালি জায়গায় মাটির নিচে পুঁতে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু সেখানে লোকজনের উপস্থিতির কারণে মাটিতে পুঁততে না পেরে লাশটি নিয়ে পূনরায় হোটেলের জেনারেটর কাম স্টোর রুমে রেখে পালিয়ে যায়।