সেলিনা আক্তার নুপুর

রাত বারোটা। হাজেরা বেগমের রুম থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। কান্নার শব্দ শুনে হাজেরা বেগমের ছেলেরা ও ছেলের বউরা হাজেরা বেগমের রুমে ছুটে গেলো। হাজেরা বেগম তখনো রীতিমতো কেঁদেই যাচ্ছেন। ছেলেরা মায়ের কাছে জানতে চাইলো – মা তুমি কেন কাঁদছো? কিন্তু তিনি কোন উত্তর দিলেন না। জামিল সাহেব পাশেই বসেছিলেন। তিনিও কথা বলছেন না। খাটের কোনায় চুপ করে বসে আছেন।

ধানমন্ডি ১৫ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর বাসায় হাজেরা বেগম ও জামিল সাহেব দম্পতি বাস করেন। তাদের তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। জামিল সাহেব একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসা তিনি খুব ভালই বোঝেন। তিনি তার ব্যবসা টাকে অনেক কষ্ট করে দাঁড় করিয়েছেন। জামিল সাহেবের এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট এর ব্যবসা। ব্যবসা ভালই চলছে। কিন্তু জামিল সাহেবের বয়স হয়েছে। আজকাল শরীর খুব একটা ভালো থাকে না। তাই তিনি তাঁর ব্যবসার দায়িত্ব তিন ছেলে কে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তাঁর তিন ছেলে বাবার ব্যবসা ভালো ভাবেই দেখাশোনা করছে।

আর জামিল সাহেবের দুই মেয়ে নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত।পাশাপাশি দুই মেয়েই চাকরি করে। বড় মেয়ে ইলা একটা বেসরকারি কলেজের লেকচারার। ইলার দুই মেয়ে। ইলা চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মেয়েদের বেশি সময় দিতে পারে না।তাই ইলার মেয়েরা বেশির ভাগ সময় নানুর বাসায় থাকে। আর ছোট মেয়ে শিলা একটা প্রাইভেট ব্যাংক এ চাকরি করে।শিলার বিয়ে হয়েছে চৌদ্দ বছর। কিন্তু কোন সন্তান নেই। শিলার শারীরিক জটিলতার কারণে ডাক্তার বলে দিয়েছে সে কোনদিন মা হতে পারবে না।

জামিল সাহেব, তার স্ত্রী হাজেরা বেগম, তিন ছেলে, ছেলের বউ আর নাতি নাতনী নিয়ে যৌথ পরিবার। জামিল সাহেব নাতি নাতনীদের সাথে সময় কাটাতে ভালবাসেন। তাঁর দিনের অনেকটা সময় কাটে নাতি নাতনীদর সাথে গল্প আর দুষ্টুমি করে আর বাকী সময় পত্রিকা পড়ে আর হাজেরা বেগমের সাথে খুনসুটি করে। জামিল সাহেব শান্ত প্রকৃতির, হাস্যজ্জোল, পরোপকারী ও অত্যন্ত ভালো মানুষ।

হাজেরা বেগমের কান্না দেখে তার ছেলে আর ছেলের বউরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছোট ছেলে শাহেদ মায়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো মা কি হয়েছে? কিছু না বললে বুঝবো কিভাবে? হাজেরা বেগম বললেন, একটু আগে শিলা ফোন করে বলেছে, শিলার স্বামী জাহিদ শিলার সাথে ঝগড়া করে কাপড় চোপর নিয়ে চলে গেছে। আর যাওয়ার সময় বলে গেছে আর কখনো ফিরবে না। হাজেরা বেগম কাঁদছেন আর বিলাপ করে বলছেন, এখন আমার মেয়েটার কি হবে? ছেলেরা মা কে শান্তনা দিচ্ছে আর বিভিন্ন জায়গায় ফোন দিয়ে জাহিদ কোথায় গেছে জানার চেষ্টা করছে। এদিকে জাহিদের ফোন বন্ধ পাচ্ছে।

জাহিদ একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডিরেক্টর। শিলা ও জাহিদের মধ্যে কয়েক বছর ধরেই টানাপোড়েন চলছিল। প্রায় সময়ই দুজনের মধ্যে ঝগড়া ও মনোমালিন্য হতো। এর মধ্যে একটা বড় কারন ছিল সন্তান না হওয়া। শিলা অবশ্য একটা সন্তান দত্তক নিতে চেয়েছিল। কিন্তু জাহিদ রাজি হয়নি। জাহিদের নিজের সন্তান লাগবে বংশ রক্ষার জন্য। জাহিদ আরেকটা বিয়ে করবে শিলা সেটা মানতে নারাজ।

হাজেরা বেগমের তিন বউ শাশুরির মাথার কাছে বসে আছে। ছোট বউ নীলা স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। কি বলবে বা কি বলা উচিত বুঝতে পারছে না। তার কি এই সংবাদে দুঃখ পাওয়া উচিত সেটাও বুঝতে পারছে না। কিন্তু শাশুড়ী কে শান্তনা ও দিতে ইচ্ছে করছে না। তাই চুপ করে বসে আছে।

ছেলেরা জাহিদ কে যেভাবেই হোক ফিরিয়ে আনবে কথা দিয়ে মা কে ঘুমাতে বললো। এতক্ষণে হাজেরা বেগম কিছুটা শান্ত হলেন। এখন তিনি ঘুমাবেন তাই সবাইকে যার যার রুমে চলে যেতে বললেন। সবাই যার যার রুমে চলে গেল।

রাত আড়াই টা। শাহেদ আর নীলা নিজেদের রুমে এসে শুয়ে পড়লো। অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও নীলার চোখে ঘুম আসছে না।নীলা দেখে শাহেদ নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। ঘুম না আসাতে নীলার খুব অস্বস্তি লাগছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে যখন দেখলো রাত সাড়ে তিনটা বাজে।নীলা বুঝলো আজ আর তার ঘুম আসবে না। নীলা বারান্দায় গিয়ে গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাতেই দেখলো আকাশে খুব সুন্দর পূর্নিমার চাঁদ। সেই চাঁদের আলোয় পুরো বারান্দা আলোতে ভরে গেছে। নীলার চাঁদ দেখতে ভালোই লাগছে। সেই সাথে অতীতের যত স্মৃতি তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। সুখের আর দুখের নানান স্মৃতি।

নীলা রাজশাহীর মেয়ে। সেখানেই তার জন্ম, বেড়ে ওঠা। নীলা বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। অনেক আদরের। নীলার বাবা রফিক সাহেব রাজশাহী মহিলা কলেজের প্রিন্সিপাল। মা রেহানা বেগম হাই স্কুলের শিক্ষিকা। স্বচ্ছল পরিবার। নীলা জন্মের পর থেকে কখনো অভাব দেখেনি। অতি আদরে বড় হয়েছে সে। ছোট বেলা থেকেই নীলা ছিল খুব চঞ্চল, স্বাধীনচেতা ও আহ্লাদী প্রকৃতির। খুব স্বাধীন ভাবে বড় হয়েছে সে। আর তার বাবা মা- ই ছিল তার খুব ভাল বন্ধু।

নীলার বয়স যখন উনিশ বছর। অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী। তখন সে এই বাড়িতে বউ হয়ে আসে। শাহেদের সাথে নীলার এরেন্জ ম্যারেজ। তাই দুইজন দুইজনকে আগে থেকেই চেনা জানার সু্যোগ হয়নি। বিয়ের পর নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে একটু কষ্ট হচ্ছিল। তরপর ও মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু নীলা লক্ষ্য করলো কেন যেন শশুর বাড়ির সবার মন জয় করতে পারছে না।

একমাত্র নীলার শশুর জামিল সাহেব নীলাকে নিজের মেয়ের মত ভালবাসেন। নীলাও তাকে বাবার মত ভালবাসে ও সম্মান করে। জামিল সাহেব চা খাওয়ার সময়, পত্রিকা পড়ার সময় নীলাকে পাশে নিয়ে গল্প করেন। তিনি সব সময় নীলা কে নিজের কাছে রাখতে চান। কিন্তু এসব দেখে নীলার শাশুড়ী হাজেরা বেগম ক্ষিপ্ত হন। রাগে গজগজ করতে থাকেন।

নীলা বাবার বাড়িতে কখনো কাজ করেনি। তাই শশুর বাড়িতে তার সারাক্ষণ কাজের জন্য অনেক কথা শুনতে হয়। তার ওপর এই দোষ ওই দোষ তো আছেই। শাহেদ তো ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত। তাছাড়া সে তার মায়ের ওপর কথা বলতে পারে না। এই পরিবারের পুরো আধিপত্যই তার মায়ের ওপর। নীলার নিজেকে খুব অসহায় লাগে। কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারে না। কারন সে যে এই বাড়ির বউ। বউদের কোন কিছু বলার অধিকার নেই।

শাহেদ বিয়ের দুই দিন পরে নীলাকে বলেছিল তুমি এই বাড়ির বউ না, মেয়ে হয়ে থাকবে। নীলা হ্যা সূচক মাথা নাড়ে। তার কিছু দিন পর নীলার হাতে চুরি নেই দেখে নীলার শাশুড়ী খুব রেগে গেলেন। অনেক কথা শুনালেন। নীলা বললো- মা চুরি পরে কাজ করতে সমস্যা হয় তাই খুলে রেখেছি। নীলার শাশুড়ী রেগে গিয়ে বললেন, দেখ তুমি এই বাড়ির বউ, মেয়ে না। নিজেকে মেয়ে ভাবার চেষ্টা করো না। আমি যা বলবো তাই করবে। নীলা মনে মনে ভাবছে সে কার কথা শুনবে? শাহেদের নাকি শাহেদের মায়ের? নীলা কিছু বলতে গিয়ে ও থেমে গেল।সে এই কয়দিনে এতটুকু বুঝে গেছে শশুর বাড়িতে কোনো যুক্তি চলে না।

নীলার বিয়ের এক বছর পার হতে না হতেই শুরু হলো বাচ্চা হচ্ছে না কেন এই নিয়ে কানাঘুষা। অবশ্য এর জন্য শাহেদ নীলাকে অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে। তবুও কিছু হচ্ছে না। তবে ডাক্তাররা তেমন কোনো সমস্যা নেই বলে জানিয়েছে। একদিন শাহেদের মা শাহেদ কে ডেকে বললেন, এভাবে আর কতদিন? বউয়ের মুখ দেখে কি জীবন কাটবে? নীলা কে ডিভোর্স দিয়ে আরেকটা বিয়ে করতে বললেন। শাহেদ কিছুতেই রাজি হলো না। নীলা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সব শুনলো। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পরতে লাগলো। সে চোখের পানি লুকাতে চাইলো। সে জানে এই ইট পাথরের শহরে কারো চোখের পানি তে কারো কিছু আসে যায় না। কিন্তু চোখের পানি যেন বাঁধ মানছে না।

আজ তার নিজের মেয়ে নিঃসন্তান হওয়াতে যখন মেয়ের জামাই মেয়ে কে ছেড়ে চলে গেছে, এখন তিনি মেয়ের কথা চিন্তা করে হাউমাউ করে কাঁদছেন। কি আশ্চর্য এই সমাজের রীতিনীতি!! আচ্ছা, শাশুড়ী কি কখনো মা হতে পারে না? নাকি এমন কোন নিয়ম নেই।

বিয়ের সময় কথা ছিল নীলা বিয়ের পরে ও পড়াশোনা করবে।কিন্তু না, সেটা আর হয়ে ওঠেনি। শশুর বাড়ির সবার একই কথা। বিয়ে হয়েছে আর পড়ে কি হবে? মন দিয়ে সংসার কর।নীলার শশুর চেয়েছিলেন, নীলা আরও পড়াশোনা করুক। সমাজ সংসারের নিয়মের কাছে তিনি হেরে গেছেন।

চার দেয়ালের মাঝে নীলার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। এখানে টাকা পয়সা, আভিজাত্য কোনো কিছুর অভাব নেই। নেই শুধু প্রানের স্পর্শ। নীলা তার বাবা মা কে খুব মিস করে। মিস করে তার ফেলে আসা দিনগুলো কে, সেই মেঠোপথ, খেলার মাঠ, ধানের ক্ষেত আর চিরচেনা মুখগুলোকে। এসব মনে পরতেই নীলার খুব কষ্ট হয়। ভীষণ কষ্ট। কিন্তু না, এই কষ্ট কাউকে বলা যাবে না। কারন ঘরের বউদের কোন কষ্ট থাকতে নেই।

একবার নীলার মা নীলাকে বলেছিল, শশুর বাড়ি গিয়ে আমাকে ভুলে যাবি না তো? নীলা হেসে হেসে (দুষ্টুমি করে) মা কে বলেছিল, হুম ভুলে তো যাবোই। আমার শাশুড়ী আমাকে এত আদর করবে,তোমার কথা মনে করার সময়-ই পাবো না।মাকে তার প্রতি মুহূর্তে মনে পড়ে। মাকে জড়িয়ে ধরে বলতে ইচ্ছে করে,

মা তোমাকে অনেক অনেক ভালবাসি।
খুব মিস করি তোমাকে।

এসব ভাবতে ভাবতে নীলার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। দুফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে পড়লো।