শহীদুল হক বাদল

সোমা কাল সকাল দশটার বাসেই সে মোহনগঞ্জে তার বাবার বাড়িতে চলে যাবে। প্রায় একযুগের সম্পর্কের ইতি টানতে শেষপর্যন্ত শাহেদকে রাজি হতেও হলো। যা অনেকটাই সোমার জেদের কারনেও। সেজন্যই, আজ সন্ধ্যার পর থেকে নিজের টুকিটাকি সবকিছুই গুছিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে সোমার। তাদের ছেলেমেয়ে দু’টো আপাতত তার মায়ের সঙ্গেই থাকবে। ওদের মাসখরচের টাকা শাহেদ ডাকযোগে পাঠিয়ে দেবে সোমাকে- এমনই কথা হয়েছে সমঝোতায় দু’জনের। এবার নিছক রাগ-অভিমানের যাওয়াও এটা নয় আজ।

এবার সত্যি সত্যিই সে বাপের বাড়িতে চলেও যাচ্ছে শেষবারের মতো সম্পর্কটা চুঁকিয়ে। শাহেদও আজ অফিসে যায়নি সে ইচ্ছে করেই। গায়েও আজ তার ভীষণ জ্বর। অথচ সারা শরীরে একটা কম্বল মুড়িয়ে সে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে নিশ্চিন্তেই বারবার টিভির চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কার্টুন ছবি দেখছে, আর নিজে নিজেই সে হাসছেও খুব। কিন্তু, ভেতরে যে তার ভাঙচুরের নিঃশব্দ একটা স্রোত বয়ে যাচ্ছেও- ওটা বোধহয় কাউকেই সে বোঝতেও দিচ্ছে না কোনোভাবেই। সেজন্যই, সোমাও ভাবছে যে আধবুড়ো বয়সে এই লোকটার কী কোনোই বোধজ্ঞানও নেই?

দাম্পত্য জীবনের শুরু থেকেই শাহেদ কেমন জানি অদ্ভূত এক নির্জীব ও উদাসীনও ক্ষাণিকটা। সেইসব নিয়েই দু’জনের যতো না দ্বন্দ্ব আর শত মতবিরোধ। এমন বেখেয়ালী একটা মানুষের সঙ্গে যে কী করে আজীবন একসঙ্গে থাকা যায়? সোমার এখন সবই অসহ্যও লাগছে। তাই সেও বোধহয় হাফিয়েও উঠেছে ক্রমেই। ওদিকে ছেলেমেয়েরাও আঁড়চোখেই তাদের মায়ের কান্ডকারখানাও দেখছে। এমনটা দেখে দেখেই ওরাও অনেকটা অভ্যস্তও হয়ে গেছে। বাচ্চারা হয়তো ভাবছে, আর কিছুক্ষণ পরই বাবা-মা ফিসফিস করে ইশারায় দু’জনে কথা বলবে। এভাবেই সবকিছুই স্বাভাবিকও হয়ে আসবে।

কিন্তু সোমার জেদের উত্তাপ যে এখনও থামছেই না, তা দেখে ওরাও এখন কিছুটা হলেও বিস্মিত। সোমা এবার মুখ ফিরিয়ে অমি’কে বললো-
– শোনো, আমি কিন্তু তোমাদের নানার বাড়িতে একেবারেই চলে যাচ্ছি। সঙ্গে তোমরাও যাবে, ঠিক আছে তো?
প্রমি ও অমি মায়ের কথা শুনেই ফ্যাল-ফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইলো শুধু। অতঃপর সোমা প্রমিকে বললো-

– যাও তো মামনি তোমার বাবাকে একটু এঘরে আসতে বলো।
শাহেদ কিছুক্ষণ পর বেডরুমে এসেই মেয়েকে তার কোলে নিয়ে খাটের এক কোণায় বসলো। সোমা এবার শাহেদকে লক্ষ্য করেই বললো-

– এই যে আমার ব্যাগ। সব চেক করে খুলে দ্যাখো, পরে কিন্তু বলতে পারবে না যে- আমি টাকা-পয়সা বা তোমার গুপ্তধন নিয়ে পালিয়ে গেছি। ওরা দু’জনই কিন্তু সাক্ষী থাকলো। বলাতো যায় না- যে মিনমিনে স্বভাব তোমার। থানায় কেসটেইসও করে দিতে পারো।

একথা বলে সোমা মুখ আঁড়াল করেই হাসলো। অসহায় ঠোঁটে শাহেদেরও তখন মৃদু হাসির এক আভা। আজ বড্ডই ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাকেও। এখন আর ওসবের প্রতি সোমারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এবার নীরবতা ভেঙেই শাহেদ বললো-

– যা ইচ্ছে হয় তোমার নিয়ে যাও তো। এই সংসারটা না থাকলে, এসব ছাইপাস দিয়ে আমিইবা কী করবো? একা একজন মানুষ, বাজারে গিয়ে হোটেলে না হয় দু’বেলা খেয়ে নিলেই হলো। এবার সোমা কিছুটা খোঁচা মেরেই তাকে বললো-

– ‘তুমি একা হবে কেন গো? ঐ যে পাশের ফ্ল্যাটের ফয়সাল ভাবীর আইবুঁড়ো সুন্দরী বোনটা আছে না। তোমাকে সে বারান্দায় দাঁড়ানো দেখলেই নাকি সারাক্ষণ জানালার পাশে বসে থাকে। যেন তিনি কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত দেখছেন। আমি চলে গেলে তো ঐ বজ্জাতটার ভালোই হবে, তাই না? আর তুমিও তো বনলতা সেনের পাশে বসে কাব্যচর্চা করতে পারবে- কী বলো? মায়ের রসিকথায় বাচ্চারাও সাবধানে মিটমিট করে হাসছে। তবে সোমার রসিকথায় শাহেদ এবার কিছুটা বিরক্ত হয়েই বললো-

– দ্যাখো সোমা! সারাজীবনের জন্যই তো তুমি চলে যাচ্ছো। গায়ে পড়ে এখন আর ঝগড়া না করলেই কী নয়? তাছাড়া, আমার স্বভাব-চরিত্রও তো জানো তুমি।

তখন সোমাও ক্ষাণিকটা নরম সুরেই শাহেদকে বললো-
– জানি বলেই তো এতোটা ভয় আমার। তোমাকে বোকা পেয়ে না ঐ বজ্জাত মেয়েটা আবার মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খায়।

মনে মনে সোমাও হয়তোবা চাইছিলোও যে, শাহেদ তাকে না যাওয়ার জন্য কিছু একটা বলুক। কিন্তু শাহেদকে নিরুত্তর দেখেই সোমাওর মনে ক্ষোভ বা জেদ আরো বেড়ে গেলো। সোমা রাগান্নিত স্বরেই এইবার বললো-

– ‘প্লীজ, তুমি ওঘরে যাও তো। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে এখন। আমি ঘুমাবো একটু।
ঐদিন মাঝরাত থেকেই হাড়-কাপুঁনি দিয়ে শাহেদের গায়ের জ্বর বাড়তে থাকে। পা টিপে টিপে আবছা আলোয় চুপিসারে শাহেদ বেডরুমে ঢুকে ড্রয়ার হাতড়িয়ে কয়েকটা প্যারাসিটামল টেবলেট বের করে আনলো।

অন্ধকার ঘরে তখনও এক বিষন্ন আলো। ছেলে-মেয়ে দু’টোই তাদের মাকে জড়িয়ে ধরে এলোপাতাড়ি পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছে ওরাও। আলো-আঁধারে সোমাকেও আজ যেন বেশ মায়াবী লাগছে। কিছুক্ষণ পর শাহেদ বাথরুমে এসে পানির কল ছেড়ে সে নিজেই মাথায় পানি ঢাললো। পানির শব্দ পেয়ে সোমারও হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। বাথরুমে উঁকি মেরে সোমা নি:শব্দে সবই চেয়ে চেয়েই দেখলো। কিছুক্ষণ পর এক গ্লাস নেবুর সরবত বানিয়ে এনে সোমা ড্রয়িংরুমে এসে শাহেদকে বললো-

– এই সরবতটা খেয়ে নাও। ভালো লাগবে তোমার। ঔষধ কী আরও কিছু লাগবে তোমার?
শাহেদ মাথা নাড়িয়ে নিষেধ করলো তাকে। যদিও সোমার তখন ইচ্ছে করছিলো, আজ মাথায় বিলিকেটে শাহেদকে ঘুম পাড়িয়ে দিবে সে। কিন্তু মনের শত দ্বিধা আর সংকোচে তা বোধহয় আজ সম্ভব নয়। আজ সোমার মনের ব্যাকুলতা তার সংকীর্ণতার বেড়াজালকে কিছুতেই ছিন্ন করতে পারেনি ওভাবে। এখানেই ভালোবাসা হয়তোবা পরাজিতও, কিংবা বদলাতে থাকে অচেনা এক ভিন্নরুপেও। সোমা মূলত: অভাবের সংসারে এতোটা অভ্যস্তও নয় সে। আবার অবৈধভাবে স্বামী তার অর্থ উপার্জন করুক- তাও বোধহয় সে চায় না।

দু’জনের যতোটা বিরোধ তা হলো- শাহেদের যথেষ্ট যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তার এমন একটা গা ছাড়া ভাব। ওর প্রায় সব বন্ধুরাই ভালো বেতনের চাকরিও করছে। অথচ, মফস্বল শহরে প্রাইভেট একটা ফার্মে তার এই চাকরিটাই যেন শাহেদের কাছে এক সোনারহরিণ। বাচ্চাদের পড়াশুনার দিনদিনই তো খরচও বাড়ছে। লোকটা যে দু’একটা টিউশনি করবে, তারও কোনো চেষ্টাই নেই। রাজধানী ঐ শহরে কিছুতেই শাহেদ যাবে না। অবসর সময়ে সারাক্ষণ সে কাব্যচর্চা আর টিভি দেখেই তার সময় কাটে। বহুবার বলে বলেও সোমা এবার হাল ছেড়ে দিয়েছে সেও।

পরদিন, বাচ্চাদের জামা-কাপড় পরিয়ে সোমা সকাল সকাল সে নিজেও তৈরি হয়ে নিলো। রাতেই শাহেদের জন্য প্রায় দু’দিনের ভাজি-তরকারি রান্না করেও ফ্রিজে রেখে দিয়েছে সে। কারণ, শাহেদ যে অলস মানুষ- হয়তোবা পাউরুটি-কলা খেয়েই সে ক’দিন পার করে দেবে কে জানে? বাচ্চারা অবশ্য এখনো বুঝতে পারেনি যে, তাদের আম্মু শেষবারের মতো সংসারের পাঠ চুকিয়ে চলে যাচ্ছে। প্রমি ও অমি দু’জনই সিড়ি বেয়ে বাবার হাত ধরে নিচে নামছে। অমি হঠাৎ তার বাবাকে বললো-

– তুমি কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি চলে এসো বাবা! আমরা এবার কিন্তু দাদুর বাড়িতে একসঙ্গে বেড়াতে যাবো। চাচ্চুকে নিয়ে পুকুরে মাছ ধরবো কেমন?

শাহেদ অমি’র মাথায় এক হাত বুলিয়ে ম্লান মুখে শুধুই হাসলো । বিদায় মুহুর্তে সোমার মনের ভেতরও একটা নিঃশব্দ ঝড় বয়ে যাচ্ছে তখন। চাপা কান্নার অশ্রু, লজ্জায় সে কাউকেই দেখাতে চায় না আজ। নিজের উপরও তার রাগ বাড়ছে ক্রমেই। এতোটা জেদের বসে হুট করে বিচ্ছিন্নের সিদ্ধান্ত না নিলেও সে পারতো। অন্যবারের মতো আজ শাহেদের সমঝোতার ভূমিকাও নেই দেখে সোমারও মনের ক্ষোভটা আরও বেড়ে গেছে বেশীই। তবে কী শাহেদের অন্তরেও ভালবাসার টান ক্রমেই ফিকে জোছনার মতো আলোহীন হয়ে আসছে এখন।

এতোকালের চেনা এই মানুষটাকে আজ যেন বড্ডই অচেনা লাগছে সোমারও। বাচ্চাদের নিয়ে সোমা এবার রিকশায় চড়ে বসলো। বাসস্ট্যান্ড তেমন দূরেও নয়। চলন্ত রিকশায় বসে পিছু ফিরে প্রমি ও অমি বারবার তাদের বাবাকে দেখছে। সোমাও একবার পিছু ফিরে তাকলো। দেখতে পেলো যে, শাহেদ মূর্তির মতেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আকাশপানে তাকিয়ে আছে নিঃশব্দেই।

সোমার মনেও একটা অনুশোচনাবোধ জাগলো। সেও ভাবছে, শাহেদের শাস্তিটা বোধহয় বেশিই হয়ে গেছে। মানুষ মাত্রই তো স্বভাবসূলভ তার কিছু ভিন্নতা থাকবেই। শাহেদের দীর্ঘদিনের মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গিও- এসব সে নিজের মতো করে পাল্টে দিতে গিয়েই তো সোমা আজ হোচট খেলো। পরস্পর দু’জন ভালবাসায় আন্তরিক নাহলে, সাময়িক সমঝোতায় কোনোদিনই এই বিশার জীবনের তাল মেলে না।

বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছেই সোমা হঠাৎ তার মত পাল্টালো। কাছেই ওর এক বান্ধবীর বাসায় সে বিকেল পর্যন্তই সময় কাটিয়ে প্রায় সন্ধ্যায় সে নিজ বাসায় ফিরে আসছে এখন। বাসার সামনে এসেই দোতলায় তার চোখ পড়ল তার। ওদিকের সব ক’টি বাসার ভেতরেই তখন আলো জ্বলছে। অথচ, তাদের বাসার সব কক্ষই কেন যেন অন্ধকার। সোমাও ভাবছে- তবে কী শাহেদ বাসায় নেই? মাকে এমনতর চিন্তিত দেখেই প্রমি বললো-

– বাবার গায়ে তো খুবই জ্বর ছিল। মা… তুমিও আজ এতোটা রাগ না করলেও তো পারতে।
সোমাও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েকে তার বললো-

– আচ্ছা চল তো, উপরে গিয়ে দেখি না- কী হয়েছে।

উপরে উঠতেই সোমা দেখতে পেলো, দরজায় কোনো তালা দেয়াও নেই। সামান্য এক ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেলো। ভেতরে তখনও আবছা ঢিম-লাইটের আলো জ্বলছে। সোমা এইবার রাগ করেই বললো-

– তোর বাপটা কী যে একটা বেখয়ালী মানুষ না। চোর এসে সবকিছু নিয়ে গেলেও যে তার হুস হবে না কোনোদিনই। আমাকে না জ্বালাতন করলে কী আর তোর বাপের ঐ আত্মার শান্তি হয় না?

ওদিকে কম্বল মুড়িয়ে শাহেদ তখনো ঘুমোচ্ছে বিছানায়। হয়তোবা, কিছুই খায়নি এই মানুষটা এখনো। শাহেদকে এভাবে দেখে এখন সোমারও খুব মায়া হচ্ছে। মাথার উপর থেকে কম্বলটা সরিয়ে দিয়ে সোমা শাহেদের কপোলে তার একটা হাত রাখলো। আহ্…! সারা গা যে তার পুঁড়ে যাচ্ছে জ্বরে।

শাহেদ এবার চোখ মেলে তাকাইতেই, সোমাও বেশ লজ্জা পেলো। নিজের দুচোখের অশ্রু আর ধরে রাখতেও পারলো না সে। বচ্চা দু’টো ইতোমধ্যেই জামা-কাপড় পাল্টিয়ে ফেলে বেডরুমে বসে কী নিয়ে যেন মজার কিছু খেলছে। ওঘর থেকেই তাদের হাসির শব্দও এখানে আসছে। সোমার দু’চোখেই টলমলে ভরা জল।

শাহেদ বিছানায় শোয়া অবস্থাই কিছুটা উঠে সোমার কাঁপা হাতটা তার নিজের বুকের মধ্যে টেনে ধরলো। হঠাৎ সব নিস্তব্ধতা ভেঙেই যেন ব্রহ্মপুত্রের ওপার থেকে বুক কাঁপিয়ে জুট মিলের সাইরেনটা বেজে উঠল।

আবার ঘরমুখো মানুষের ঢল নামলো রাস্তায়। অপেক্ষার প্রহর গুনছে, কতো না প্রিয়জন… কারো জন্য প্রতিক্ষায়। রাতও তখন বেশ গভীর হতেও থাকে ক্রমেই। সান্নিধ্যের উষ্ণ আয়োজনেও বাড়তে থাকে অন্যরকম একটা ব্যাকুলতা, বড্ড নিঃশব্দেই সেই নিশুতি রাতের আয়োজনের…