খোলাবার্তা২৪ ডেস্ক : সমাজে এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে নিজেকে ক্ষমতাধর মনে করার, হঠাৎ করেই উত্তেজিত হয়ে পড়ার প্রবণতা কী বাড়ছে? কেন বাড়ছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম মনে করেন, ক্ষমতা বা দম্ভ দেখানো আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে গেছে৷

ডয়চে ভেলে : সম্প্রতি এলিফ্যান্ট রোডের একটি ঘটনায় গাড়িতে স্টিকার এবং গায়ে অ্যাপ্রোন থাকার পরও পুলিশ কেন একজন নারী চিকিৎসকের কাছে পাস চাওয়ায় তুলকালাম ঘটে যায়…

অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম : প্রথমত আমি সেখানে ছিলাম না৷ আবার আমাদের দেশের মিডিয়াতে যেভাবে লেখা হয়, সেটা কতটা বিশ্বাসযোগ্য সেটাও বলা মুশকিল৷ আমি একটি ভিডিও ক্লিপ দেখলাম, কিন্তু তার আগে-পিছে কী হয়েছে সেটা তো জানি না৷ তবে যেটুকু মনে হয়েছে, একটা ভুল বোঝাবুঝির ব্যাপার৷

ওই ডাক্তার খুবই আহত হয়েছেন৷ তার ধারণা হয়েছে, কোভিড রোগীদের চিকিৎসার জন্য তারা এত সময় দিচ্ছেন, কিন্তু পুলিশ তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছে না৷ আবার তার ভাষা ব্যবহার খুব শালীন ছিল সেটাও বলা যাবে না৷

এই ধরনের ভুল বোঝাবুঝি আমাদের দেশে সবখানেই চলে৷ হাসপাতালে যান, সেখানে রোগীর সঙ্গে ডাক্তারের হয়, রেলওয়ে টিকিট কাউন্টারে যান, সেখানে যারা টিকিট বিক্রি করেন তাদের সঙ্গে যাত্রীদের হয়৷ এই বাদানুবাদ আমাদের সমাজের চলমান একটা প্রক্রিয়া৷

আমরা কি এখন হুট করেই একটু বেশি উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছি না?

এটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই৷ এখন যে পরিবেশ, এটা তার ফল৷ কোভিড যেভাবে হানা দিচ্ছে, মানুষ যেভাবে কাজ হারাচ্ছে, মানুষ যেভাবে শোক ও অপঘাতের শিকার হচ্ছে, পরিবারের ভেতর কেউ যদি হারিয়ে যান, চিকিৎসার সুযোগ না পান, তাহলে ক্ষুব্ধ হওয়া মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক৷ এটি শুধু আমাদের দেশে নয়৷

জার্মানির মতো জায়গায় মানুষ রাস্তায় নেমেছে, লন্ডনে রায়ট হয়েছে, অ্যামেরিকাতে বিক্ষোভ হচ্ছে৷ এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা৷ এর পেছনে যে মহামারি চলছে তার বড় ভূমিকা আছে৷

আমাদের সমাজটাই একটা অস্থির সমাজ, সে কারণে আমরা সব সময় উত্তেজিত থাকি৷ আমাদের মনে হচ্ছে, এখানে একটু বেশি হচ্ছে৷ আসলে তা নয়৷ যুক্তিবাদী সমাজেও এটা হচ্ছে৷

প্রিয়জন মারা গেলে মানুষ পাশে দাঁড়াতে পারছে না৷ মস্ত বড় বঞ্চনা তৈরি হয়েছে৷ সেখান থেকেই প্রতিক্রিয়াগুলো হচ্ছে৷ আমি মনে করি, যখন মহামারি চলে যাবে, তখন সুস্থিরতা ফিরে আসবে৷

সাধারণত আমরা যে কোনো ঘটনায় প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করি৷ ওই নারী চিকিৎসকের হঠাৎ করেই ক্ষুব্ধ হওয়ার পেছনে কী করোনার চিকিৎসায় চাপ, নাকি তার ক্ষমতা?

উত্তেজিত হলে মানুষ অনেক কিছুই বলে৷ ঠান্ডা মাথায় যারা ক্ষমতা দেখায়, আর যারা উত্তেজনার বশে ক্ষমতা দেখায়, তার মধ্যে আমি একটা বিরাট তফাৎ করতে চাই৷ দেখবেন, পুলিশ যখন কোনো ছাত্রনেতাকে ধরে, তখন ওই ছাত্রনেতা হম্বিতম্বি করে পুলিশের চেয়ে তার ক্ষমতা বেশি সেটি দেখানোর চেষ্টা করে৷

এটির নিষ্পত্তি হতে পারতো, যদি দুই পক্ষই সমাধানের উদ্যোগ নিতেন৷ আমাদের সমাজে পরিবারে, কোথাও গণতন্ত্র নেই৷ আমরা শুধু রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের অভাব খুঁজি, আমাদের সমাজেও তো গণতন্ত্র নেই৷ আমাদের পরিবারেও গণতন্ত্র নেই৷

পিতৃতান্ত্রিক পরিবারে তো কোনো মেয়ে গলা চড়িয়ে কথা বলতে পারে না৷ সেখানে একটি মেয়ে বলছে বলে সবাই তাকাচ্ছেন৷ অথচ পুরুষরা তো প্রতিনিয়ত বাইরে গিয়ে ক্ষমতা প্রদর্শন করছেন, সেটা তো কেউ আগ্রহ নিয়ে দেখছেন না৷ একজন নারী এই ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে সব ক্যামেরা তার দিকে তাক করা, এটি অনাকাঙ্খিত৷

ক্ষমতা দেখাতে গিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়া কতটা যৌক্তিক?

আপনি যদি ক্ষমতার প্রভাব দেখাতে চান, তাহলে তো আপনি যুক্তি মানছেন না৷ প্রথমত, ক্ষমতাটা দেখানোর কিছু নেই৷ একজন মানুষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, এই দায়িত্বের সঙ্গে তার অনেক রকমের কর্তব্য থেকে যায়৷ যে নিজের কর্তব্য সুচারুভাবে করে, সে তো ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারেন না৷

আর যে ক্ষমতাকে নিচ্ছে নিজের উন্নতির জন্য, পরিবারের উন্নতির জন্য, সে তো ক্ষমতা দেখাবেই৷ দম্ভ দেখানোটা আমাদের সংস্কৃতির একটা অঙ্গ৷ দম্ভ কিন্তু একজন স্কুলের শিক্ষক দেখাবেন না৷

একজন দোকানদার দেখাবেন না৷ দম্ভ দেখাবেন তিনি, যিনি সমাজকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান৷ গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কারো দম্ভ দেখানোর অবকাশ নেই৷ দম্ভ ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত৷ এটি আমাদের সমাজে যেমন আছে, ভারতেও আছে, পশ্চিমেও আছে৷

অনেক সময় পুলিশের দ্বারাও অনেকে হয়রানির শিকার হচ্ছেন৷ কয়েকদিন আগে স্কয়ার হাসপাতালের একজন চিকিৎসককে রাস্তায় জরিমানা করা হয়েছে৷ কিছু ঘটনায় কী পুলিশ একটু বাড়াবাড়ি করে না?

মাঠ পর্যায়ে যে পুলিশ থাকে, তাদের যেভাবে বলা হয়, তারা সেটাই করে৷ পুলিশের জীবনটা খুবই কঠিন৷ একজন ট্রাফিক পুলিশের কর্মী কিভাবে খাটেন আপনারা দেখেছেন৷ ৮-১০ ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়৷ কেউ ক্ষমতা প্রদর্শন করলে তারও রেগে যাওয়াটা স্বাভাবিক৷

আমরা নিজের অধিকারটুকু আদায় করতে চাই, কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে চাই না৷ আমার মনে হয়, মাঠ পর্যায়ে যে পুলিশ দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের পরিষ্কার কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি৷ দেখুন, সর্বাত্মক লকডাউনের নামে একটা জিনিস আমরা আবিস্কার করেছি৷

সর্বাত্মক লকডাউন হলে তো কারফিউর মতো অবস্থা হওয়ার কথা৷ সেটি না করে আমরা মানুষকে চলতে দিচ্ছি৷

নারী চিকিৎসকের ওই ঘটনার পর পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিয়েছেন চিকিৎসক ও পুলিশ৷ গুরুত্বপূর্ণ দু’টি পেশার দায়িত্বশীলরা এমন অবস্থান নেওয়ায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?

অবস্থান নেওয়ার কোনো কারণ আমি দেখি না৷ এই যে এক ধরনের দলীয় মনোবৃত্তি, ডাক্তার হলেই ডাক্তারের পাশে দাঁড়ালাম, পুলিশ হলেই পুলিশের পাশে দাঁড়ালাম- এটি আমাদের সমাজে বহুদিন ধরে প্রচলিত, কিন্তু এটা অনাকাঙ্খিত৷ আমি মনে করি এটা তাড়াতাড়ি মিটমাট হয়ে যাওয়া উচিত৷ যখন অনেক চিকিৎসক এই চিকিৎসকের পাশে দাঁড়িয়ে যান, তখন মনে হয় উনি কোনো অপরাধ করেননি৷ সামান্য যদি উনি করেও থাকেন, তখন তার মনে হবে আমি করিনি৷

আবার পুলিশের ক্ষেত্রেও সবাই যখন তার পাশে দাঁড়িয়ে যান, তখন তারও মনে হয় আমি কিছু করিনি৷ আমি মনে করি, যারা দূরে থাকেন, তাদের উত্তেজিত হওয়ার কোনো কারণ নেই৷

আমি মনে করি, ডাক্তার বা পুলিশদের যে সংগঠন আছে, তাদের ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে৷ এটি বেশিদূর গড়াতে দেওয়া উচিত নয়৷ আমি এটা দেখে মোটেও স্বস্তিবোধ করিনি৷

সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজেকে ক্ষমতাশালী মনে করার যে মানসিকতা, সেটাতে কীভাবে পরিবর্তন আসতে পারে?

পরিবর্তন তখনই আসবে, যখন আমরা জবাবদিহিমূলক প্রশাসন চালু করতে পারবো৷ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপনিবেশিক আমল থেকেই তালিম দেওয়া হয় তারা সর্বেসর্বা৷ উপজেলা বা জেলায় গেলে তিনি সর্বেসর্বা৷ তিনি তো প্রশাসক না৷ তাকে আমরা বলতে পারি সমন্বয়ক৷

আমরা যদি এমন একটা প্রশাসন চালু করতে পারতাম তিনি সবার কাজগুলো দেখবেন, কোথায় সমস্যা আছে, সেটা দেখবেন, সবাইকে নিয়ে বসবেন৷ কিন্তু আমাদের প্রশাসন চলছে বৃটিশ আমলের মডেলে৷ পুলিশ চলছে ১৮৬১ সালের বৃটিশ আইনে৷

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার জন্য প্রশাসনে যারা আছেন, তারা এমনটা ভাবতে পারেন৷ ঢালাওভাবে এটা বলা ঠিক নয়৷ অনেকেই ভালো কাজ করছেন৷ ১০ জনের মধ্যে ৩ জন খারাপ করলে তারা কিন্তু সবার প্রতিনিধিত্ব করেন না৷ প্রশাসনকে মানুষের কাছে জবাবদিহিমূলক করতে হবে৷ এর জন্য সংস্কার প্রয়োজন৷

দৃষ্টিভঙ্গির সংস্কার প্রয়োজন৷ জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে হবে৷ চর দখলের যারা প্রতিনিধি তারা নন, সত্যিকারের জনবান্ধব জনপ্রতিনিধি যারা আছেন, তাদের নিয়ে যদি প্রশাসনটা তৈরি হতো তাহলে সেখানে সমস্যা থাকতো না৷

ক্ষমতাশালী কারো সঙ্গে পরিচয় আছে বলে নিজেকে ক্ষমতাশালী মনে করার আমাদের যে প্রবণতা, সেটা থেকে পরিত্রাণের পথ কী?

ক্ষমতাকে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা৷ ক্ষমতার সঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে দায়িত্ব ও কর্তব্যের একটা সংযোগ ঘটিয়ে দেওয়া উচিত৷ এর জন্য জবাবদিহিতার প্রয়োজন৷ জবাবদিহিতার জন্য যেমন পার্লামেন্টারি কমিটি আছে৷ তাদের কাছে জবাবদিহি করা যেতে পারে৷

সুশীল সমাজ যারা আছেন, তাদের কাছেও প্রকারান্তরে জবাবদিহি করতে হবে৷ মিডিয়ার কাছে জবাবদিহি করতে হবে৷ এটা করা গেলে ক্ষমতার চর্চাটা দায়িত্ব ও সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ হবে৷ – ডয়চে ভেলে অবলম্বনে