খোলাবার্তা২৪ ডেস্ক : চলছে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ, চলছে কথার লড়াই৷ যেন কথার যুদ্ধ৷ বিসিবি কর্তারা কিছু বলছেন তো ক্রিকেটাররা তার উত্তর দিচ্ছেন। ক্রিকেটারদের কথা ধরে সাধারণ মানুষ কিছু বলছেন তো ক্রিকেটারের ‘অন্দর’ থেকে সেটার উত্তর দিচ্ছেন। যেন সবাই সবার প্রতিপক্ষ৷ বিসিবি প্রেসিডেন্ট কিছু বলছেন তো অধিনায়ক থেকে সিনিয়র ক্রিকেটাররা ছুড়ছেন পালটা পাটকেল৷ স্বজনরাও কাদা ছোড়াছুড়ি করছেন৷ আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমজনতার নিরন্তর কাটাছেঁড়াও৷

এসবের ফাঁকে ক্রিকেটটাই কেবল মিইয়ে যায় হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো৷ অথবা কে জানে, টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে দেশের মানুষের প্রত্যাশিত ক্রিকেটটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে বলেই এসব!

বড় আশা নিয়ে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে গিয়েছিল এবার বাংলাদেশ৷ বড় বড় কথা বলে; বড় স্বপ্নের মাদল বাজিয়ে৷ ক্রিকেট-মাদকতায় বুঁদ হয়ে থাকা ১৭ কোটির হৃদয়ে সেমিফাইনালের আশার রঙ ছড়িয়ে৷ কিন্তু প্রত্যাশার সঙ্গে পারফরম্যান্সের বিশ্বাসঘাতকতা তো বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই! আততায়ী স্কটল্যান্ডের কাছে অতর্কিত পরাজয়ে৷

ব্যস, ঢোলে বাড়ি! বিসিবি প্রেসিডেন্ট নাজমুল হোসেন পাপন কাঠগড়ায় দাঁড় করান পুরো দলকে৷ বিশেষত তিন সিনিয়র মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মুশফিকুর রহিম ও সাকিব আল হাসানকে৷ জবাব দিতে তারাও সময় নেননি৷ না, মাঠের ক্রিকেটে না৷ মুখের কথার তুবড়িতে৷ তাতে মিশে থাকে যাবতীয় যন্ত্রণা, হতাশা, কষ্ট, ক্রোধ৷

হোঁচটে শুরুর পর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ওমানের বিপক্ষে জয় বাংলাদেশের৷ বিশ্বকাপের সুপার টুয়েলভস, মানে মূল পর্বে ওঠাটাই তখন অনেক যদি-কিন্তুর বিন্দুতে৷ সেমির স্বপ্ন বুঝি-বা দূরের অলৌকিক অদেখা ভুবন৷ কিন্তু এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করতেই সাকিবের অহমে আঘাত লাগে৷ ‘‘স্বপ্ন কি প্রতিদিন বদলায় নাকি? আপনারা বললে বদলে ফেলব”- এমন উত্তরে মিশে থাকে ব্যঙ্গ৷ তাচ্ছিল্য৷

পরের ম্যাচ শেষে অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহর আবেগের অগ্নুৎপাত৷ ক্রিকেটারদের ‘ছোট’ করা, পরিবারের দুঃখগাঁথা, পেইনকিলারের ব্যথা- সব উঠে আসে তাঁর ব্যথাতুর শব্দ-বাক্যে৷ ত্রয়ীর তৃতীয়জন মুশফিক এরপর দেন আয়না-তত্ত্ব৷ সমালোচকদের আয়নায় মুখ দেখার পরামর্শে৷

ক্রিকেটাররা এভাবেই প্রথমে ঠারেঠোরে, এরপর একরকম ঘোষণা দিয়ে প্রতিপক্ষ বানিয়ে তোলেন সবাইকে৷ বিসিবি প্রেসিডেন্ট৷ গণমাধ্যম৷ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম৷ বুঝ-অবুঝ সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমী৷ নির্বিশেষে৷ স্ফূলিঙ্গ হয়ে ওঠে দাবানল৷ সমালোচনার দাউ দাউ আগুনে মোমের মতো পুড়তে থাকে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ স্বপ্ন৷

জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল এখানে দায় দেখেন সব পক্ষের, ‘‘এটা আমাদের সবার দোষ৷ স্কটল্যান্ডের কাছে প্রথম ম্যাচ হারের পর বোর্ড প্রেসিডেন্ট যেভাবে মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন, সেভাবে না বললেই হত৷ এটার প্রভাব সবার মধ্যেই পড়েছে৷”

বোর্ড প্রেসিডেন্টের কথাতেই কি সাকিব-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহদের অমন প্রতিক্রিয়া? ‘‘আমার কাছে তাই মনে হয়৷ এটা স্পষ্ট বোঝা গেছে৷ ওমানের সঙ্গে ম্যাচে সব ক্রিকেটারের চেহারা দেখে খুব টেনসড মনে হয়েছে৷ সবাই একদম ছোট হয়ে ছিল৷ মাহমুদউল্লাহ, মুশফিককে সাত-আট নম্বরে পাঠানো…৷ টুর্নামেন্টের শুরুতে এই ধরনের ব্যাপারের একটা প্রভাব পড়েছে” বলে উপলব্ধি আশরাফুলের৷

কিন্তু মাঠে গিয়ে তো শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটাররা খেলেন৷ তারা যদি অমন প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া না দেখাতেন, তাহলে তাদের জন্য আরেকটু নির্ভার হয়ে খেলাটা সম্ভব ছিল? নাকি নিজেদের হতাশা দূর করার জন্য এভাবে বলাটাও প্রয়োজন ছিল?

আশরাফুল তুলে আনেন অতীতের উদাহরণ, ‘‘বোর্ড প্রেসিডেন্ট তো ৯ বছর ধরে আছেন৷ উনি সবসময়ই এমন বলেন৷ (২০১৫ সালে) দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে প্রথম ম্যাচে আমরা ১৬০ রানে অলআউট হয়ে গেলাম৷ উনি সবাইকে ডেকে কথা বললেন৷ এরপর আমরা সিরিজ জিতে গেলাম৷ আসলে একেকজন একেকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়৷ তখন মাশরাফি অধিনায়ক ছিল; সে একভাবে রিঅ্যাক্ট করেছে৷ তখন হাতুরাসিংহে কোচ থাকায় এবং সুজন ভাই (খালেদ মাহমুদ) দলের সঙ্গে থাকায় ব্যাপারটি ভালোভাবে সামলাতে পেরেছে৷ এখন ওই জায়গাতে কেউ নেই বলেই হয়তো ক্রিকেটারদের প্রতিক্রিয়া একটু বেশি হয়েছে৷ তবে ক্রিকেটাররা এমনভাবে প্রতিক্রিয়া না দেখালে আরেকটু ভালো পারফর্ম করতে পারত৷”

এ সামগ্রিকতায় কি বোর্ডের সঙ্গে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের দূরত্বটাই মিডিয়ার সামনে বেরিয়ে এল?

আশরাফুলের সেটাই মনে হচ্ছে, ‘‘ভেতরের খবর তো জানি না৷ বাইরে থেকে আমার কাছে তো তাই মনে হচ্ছে৷ বোর্ড প্রেসিডেন্ট এমন কথা নতুন বলছেন না৷ যখনই খারাপ হয়, বলেন৷ এরপর আমরা আবার সাফল্যও পেয়ে যাই৷ ক্রিকেটাররা ওভাবে রিঅ্যাক্ট না করে টুর্নামেন্টটা ভালোভাবে শেষ করার কথা ভাবতে পারত৷ আসলে দুই দিকেই আছে৷ ক্রিকেটাররাও হয়তো ভেবেছে, যথেষ্ট হয়েছে৷ প্রতি সিরিজেই হয়তো-বা এসব শুনতে আর ভালো লাগে না৷”

বাংলাদেশের প্রথম টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক শাহরিয়ার নাফীস সামনে আনতে চান বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স৷ এসব কথা চালাচালির প্রভাবেই কি দল খারাপ খেলছে? ‘‘আমার মনে হয় উলটা৷ দলের পারফরম্যান্স খারাপ হয়েছে বলেই এত কিছু হচ্ছে৷ পাপন ভাইয়ের সঙ্গে ক্রিকেটারদের সম্পর্কের ব্যাপারে তো আগে আমার খুব স্পষ্ট ধারণা ছিল না৷ কিন্তু এখন বোর্ডে কাজ করার সূত্রে সেটি জানি৷ বোর্ড প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ক্রিকেটারদের যেমন সম্পর্ক, তাতে এমন কিছু বলার অধিকার পাপন ভাইয়ের আছে৷ সাকিবও তো সেদিন বলল, পাপন ভাই যে কথা বলেন, সেগুলো মাঝেমধ্যে আমাদের কাজে লাগে৷ সব মিলিয়ে আমার মনে হয়, মাঠের ক্রিকেটে আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না বলেই সবাই চাপ অনুভব করছে৷ সে চাপ থেকেই সব কিছু হচ্ছে” – নাফীসের উপলব্ধি৷

আর গণমাধ্যমের সঙ্গে ক্রিকেটারদের কথা বলার সময় আরো সতর্কতার প্রয়োজনীয়তাও দেখেন তিনি। ‘‘পরিস্থিতি ক্রিকেটারদের পক্ষে যাচ্ছে না৷ মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলার সময় ক্রিকেটারদের আরো অনেক সচেতন থাকা উচিত৷ হ্যাঁ, সামাজিক মাধ্যমে সবসময় যে রেসপন্সিবল বিহেভিয়ার হয়, তা আমি বলব না৷ এটি ঝোঁকের উপর চলে, নিয়ন্ত্রণের উপায় তো নেই৷ ক্রিকেটারদের সেদিকে মনোযোগ দেবার প্রয়োজনও আমি দেখি না৷ তবে মূলধারার গণমাধ্যমের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সময় অবশ্যই ওদের আরো সতর্ক হওয়া উচিত৷ তাহলে শেষ পর্যন্ত ওদেরই লাভ হবে৷”

টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের লাভের খাতায় কিছু যোগ হবে কিনা, কে জানে! তবে সব পক্ষ ফুঁ দিয়ে জ্বালিয়েছে যে আগুন, সেটি নেভাতে পারে কেবল মাঠের পারফরম্যান্স৷ নইলে মাঠ ও মাঠের বাইরে বাংলাদেশ ক্রিকেট হয়ে উঠবে জতুগৃহ৷ সে আগুনের আঁচ এড়াতে পারবেন কি কেউ!