বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর

মোস্তাফিজুর রহমান : মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি হিসেবে সাতজন বীরকে বাংলাদেশ সরকার মরণোত্তর ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধি দেয়। এই সাতজনের একজন ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। কেমন আছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা? সরজমিন পরিবারের সদস্যদের সাথে আলাপ করে জানা গেল অনেক পাওয়ার মাঝেও কিছু না পাওয়ার বেদনার কথা। বর্তমানে এই পরিবারে উচ্চতর ডিগ্রিধারীর সংখ্যা চল্লিশের উপরে। কিন্তু স্বাধীনতার পর আর কেউ সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেননি। নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে তাঁর জন্মভিটাসহ বসতবাড়ি এবং তাঁর স্মরণে নির্মিত স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার। ঝুঁকিতে রয়েছে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের নামে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয় এবং কলেজও।

লেখক ও বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের পরিবারের কয়েকজন সদস্য। ছবি: খোলাবার্তা২

বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের জন্ম ১৯৪৯ সালের ৭ মার্চ বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার রহিমগঞ্জ গ্রামে। বাবা আব্দুল মোতালেব হাওলাদার, মা সাফিয়া বেগম। প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন নানা বাড়ি মুলাদীর পাতারচর প্রাইমারি স্কুল থেকে। ১৯৬৪ সালে বিজ্ঞান বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৬৬ সালে তিনি বরিশাল বিএম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন তিনি।

স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর সময় তিনি পাকিস্তানে ১৭৩ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটেলিয়ানে ‘পাকিস্তান-চীন মহাসড়ক’ নির্মাণে কর্তব্যরত ছিলেন। যুদ্ধে অংশ নিতে ১০ জুন তিনি কয়েকদিনের ছুটি নেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানি সেনা ও সীমান্তরক্ষীদের দৃষ্টি এড়িয়ে শিয়ালকোট সিমান্ত দিয়ে ভারতীয় এলাকায় প্রবেশ করেন।

সেখান থেকে দিল্লি হয়ে আসেন কলকাতায়। পরে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার মেহেদিপুরে মুক্তিবাহিনীর ৭নং সেক্টরে সাব সেক্টর কমান্ডার হিসাবে যোগ দেন তিনি। সেখানে সেক্টর কমান্ডার মেজর নাজমুল হকের অধীনে যুদ্ধ করেন।

বিভিন্ন রণাঙ্গনে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখানোর কারণে তাঁকে রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর দখলের দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর আনুমানিক ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের পশ্চিমে বারঘরিয়ায় অবস্থান নেন। ১১ ডিসেম্বর সেখানে ভারতীয় বাহিনীর গোলন্দাজ বাহিনীর গোলাবর্ষণ করার কথা ছিল। কিন্তু সেটি না হওয়ায় ১২ ও ১৩ ডিসেম্বর একাধিকবার ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে ব্যর্থ হন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর। পরে একা ভারতীয় বাহিনীর সহযোগিতা ছাড়াই শত্রæদের অবস্থানে আক্রমণ করে শহীদ হন তিনি। সেই যুদ্ধে পাকসেনারা রাতের অন্ধকারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ভোর রাতে উদ্ধার করা হয় মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের লাশ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী ঐতিহাসিক সোনা মসজিদ চত্বরে এই বীর সেনাকে দাফন করা হয়। মসজিদের পূর্ব আঙিনার দক্ষিণ পাশে বর্ণিল পাথরে বাঁধাই করা দু’টি কবরের একটি ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের। মসজিদের দেয়ালের বাইরে নির্মাণ করা হয়েছে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর স্মৃতিসৌধ।

এ ছাড়া বরিশালের বাবুগঞ্জে তাঁর সম্মানে ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে ‘মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর ইউনিয়ন’। তাঁর গ্রামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার, বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর হাইস্কুল এবং বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কলেজ। ঢাকা সেনানিবাসে নির্মাণ করা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর গেট, রাজশাহীতে বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর সরণী, বিআইডব্লিউটিসির বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর ফেরি। চাঁপাইনবাবগঞ্জে গঠন করা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর ক্লাব। ঝালকাঠি জেলা স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হয়েছে এই বীরশ্রেষ্ঠের নামে।

কেমন আছেন বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারবর্গ?
কেমন আছেন বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারবর্গ? সংসারে কে কে রয়েছেন এসব বিষয়ে সরেজমিনে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেছে, অনেক পাওয়ার মাঝেও কিছু না পাওয়ার বেদনার কথা।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বীরশ্রেষ্ঠের দাদা আবদুল রহিম হাওলাদার ছিলেন এই এলাকার জমিদার। বাড়িতে শতাধিক বছরের পুরানো ও জরাজীর্ণ একতলা একটি ভবনটি এখনও কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এ ভবনটিতেই বসবাস করতেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। ভবনটি বাংলা ১৩২১ সালে নির্মাণ করা হয়। কিন্তু সংস্কারের অভাবে এটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ফলে ভবনটি ২০০৪ সাল থেকে পরিত্যাক্ত অবস্থায় রয়েছে। ভবনটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জানার জন্য জরুরিভাবে সংরক্ষণ প্রয়োজন বলে সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানিয়েছেন পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।

বর্তমানে পরিত্যক্ত ভবনের পাশে দোতলা টিনসেড ঘর তৈরি করে সেখানে বসবাস করছেন বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই মঞ্জুর রহমান বাচ্চু ও তার পরিবার।

পারিবারিক সূত্র জানায়, বরিশাল শহরের কাশিপুর এলাকায় বীরশ্রেষ্ঠের পিতার ক্রয় করা জমিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ১৯৮২ সালে চার কক্ষ বিশিষ্ট একতলা একটি ভবন নির্মাণ করে দেয়। কিন্তু জায়গা নিচু হওয়ার কারণে বর্ষা মৌসুমে ভবনটি পানিতে তলিয়ে যায়। তখন সেখানে কেউ বসবাস করতে পারে না। বর্তমান সরকার ঢাকার মিরপুরে বাড়ি করে দেয়ার কথা দিলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

এ পরিবারের অনেক সদস্য উচ্চশিক্ষিত হয়েও সরকারি কোনো চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেননি বলে আক্ষেপ পরিবারের সদস্যদের। তারা জানান, ১৯৭১ সালে এ বাড়িতে ১৮ জন সরকারি চাকরিজীবি ছিলেন। বর্তমানে এই পরিবারে উচ্চতর ডিগ্রিধারীর সংখ্যা চল্লিশের উপরে। কিন্তু স্বাধীনতার পর আর কেউ সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেননি।

এ বীরশ্রেষ্ঠের বাড়ির পাশেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জেলা পরিষদ ‘বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর’ নির্মাণ করে। এটি ২০০৮ সালের ২১ মে উদ্বোধন করা হয়। বাড়ি ও স্মৃতি জাদুঘরটি পরিদর্শনের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। জাদুঘরে দর্শনার্থী আসতে চাইলে প্রায় ১২ কিলোনমিটা ভাঙাচোরা রাস্তা পাড়ি দিতে হয়।

বাড়ির পাশেই রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর স্মৃতি কলেজ, যা ২০১১ সালের ১৪ নভেম্বর নির্মানের পর থেকে এখনও এমপিওভুক্ত হয়নি। কলেজটি সরকারি করণের দাবি জানিয়েছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা।

সবকিছু ছাপিয়ে পরিবারের সদস্য ও স্থানীদের ভয় সন্ধ্যা নদীর ভাঙন। বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের চাচাত ভাই ছরোয়ার হোসেন হাওলাদার বলেন, নদী ভাঙন এমনভাবে আমাদের গ্রাস করছে যে, আমাদের পৈত্রিক ভিটা, স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার, বাড়ি, বীরশ্রেষ্ঠের ঘর সবই হুমকির মধ্যে রয়েছে।

নদী ভাঙন রোধে সরকার বাঁধ দিলেও সেই বাঁধই এখন হুমকির মুখে। বাঁধের বড় অংশই ভেঙে গেছে। সরকারের নানা মহলে আবেদন জানিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না বলে জানান অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা ছরোয়ার হোসেন হাওলাদার। মিডিয়ার প্রতিও ক্ষোভ তাঁর।

চাচাত ভাই হাবিবুর রহমান জানান, মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ছোটবেলা থেকে খুবই মেধাবী ছিলেন। অজপাড়াগায়ের স্কুল থেকে বৃত্তি পেয়েছিলেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর।

মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের অপর চাচাত ভাই হারুন অর রশিদ বলেন, বীরশ্রেষ্ঠের নামে প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরটির পলেস্তার খসে পড়ছে। সেটির সংস্কার করা জরুরি। জাদুঘরে আসার সড়কের বেহাল দশার কথাও জানান তিনি।

হারুন অর রশীদ জানান, ভাঙাচোরা সড়কের কারণে শিক্ষার্থীরা এখানে আসা কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া রয়েছে নদী ভাঙনের ভয়। বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের স্মৃতি রক্ষার্থে নদী ভাঙন রোধে দ্রæত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তাঁর। বীরশ্রেষ্ঠের স্মৃতি স্মরণে দীর্ঘ দিন সরকার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না বলে আক্ষেপ হারুন অর রশিদের।