বিপুল মিয়া, ফুলবাড়ী প্রতিনিধি : বাংলাদেশের উত্তর জনপদের কুড়িগ্রাম জেলাধীন ফুলবাড়ী উপজেলা। এই উপজেলার ইতিহাস আছে, ঐতিহ্য আছে, আছে নিজস্ব স্বকিয়তা ও বৈশিষ্ট্য।

ধরলা নদী পরিবেষ্টিত ও ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা উপজেলা ফুলবাড়ী। ফুলবাড়ী উপজেলা একসময় কুচবিহার মহারাজা জগদ্বীপেন্দ্র নারায়ণ ভূপ বাহাদুর পূর্বভাগ চাকলার অন্তর্গত ছিল। মহারাজা ১৩২০ বঙ্গাব্দে পূর্বভাগ চাকলা পরিদর্শনে আসার পথে ধরলার নদীর উভয় তীরে কাশ ফুল দেখে মুগ্ধ হয়ে এর নামকরণ করে ফুলবাড়ী।
একটি সূত্র থেকে জানা যায়, যে ধরলা নদীর পূর্ব পাড়ে গোটা পূর্বভাগ পরগনা বা চাকলা ছিল ফুলে ফুলে ভরা পথের দুধারে, জঙ্গলে, ঝোপেঝাড়ে ,বাড়ির আঙ্গিনায় ছিল ফুলে ভরা, অসংখ্য বনফুলের মৌ মৌ গন্ধে মন প্রাণ ভরে যেত।

ফুলবাড়ী থানার মধ্য দিয়ে এক কালে প্রবাহিত হতো নীলকমল নদী। নদীর দু’তীরে ছিল অসংখ্য ফুলের সমারোহ। ফুলবাড়ী জমিদারের কাছারি বাড়ি সামনেও এক বিশাল ফুলের বাগান, সেখানে ছিল বিভিন্ন ফুলের সমাহার এই ফুলের প্রীতি ও ফুলের সমারোহ থেকে এ থানার নাম হয় ফুলবাড়ী। পূর্বভাগ পরগনার সর্বশেষ জমিদার কে ছিলেন তা আজও সঠিক ভাবে জানা যায়নি।

তবে ফুলবাড়ী কাছারি বাড়ি তা আজও স্মৃতি বহন করছে। তার কাছারি বাড়ির সামনে এক মনোরম ফুলের বাগান ছিল ওই বিলুপ্ত ফুলবাগানের কিছু নমুনা ফুল এখনো বিদ্যমান রয়েছে। কামিনীও গৌরি চাপা’র প্রাচীন গাছগুলি কালের সাক্ষী হিসেবে এখনো বাতাসে গন্ধ ছাড়িয়ে দিয়ে বলছে আমার নাম ফুলবাড়ী।

পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯১৪ সালে ৬ ই মে সরকারি গেজেট নোটিফিকেশনে ফুলবাড়ী থানা প্রতিষ্ঠিত করা হয়।

ফুলবাড়ী উপজেলার আয়তন ১৫৬.৭০ বর্গ কিলোমিটার উপজেলার আবাদি জমির পরিমাণ ১৩৫৪২ হেক্টর। উপজেলা রয়েছে উল্লেখযোগ্য ধরলা নদী এছাড়া বানিদাহ, নীলকমল, গিরিরাই, ভগোবা নদী, ফুলবাড়ীর বৈচিত্রতা বৃদ্ধি করেছে।

ফুলবাড়ী উপজেলা শহর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পড়ে রয়েছে ভারত। প্রায় ৩৬ কিলোমিটার ফুলবাড়ী সঙ্গে রয়েছে ভারতের সংযোগ , বর্তমান ফুলবাড়ী উপজেলার অন্যতম দর্শনীয় স্থান ফুল সাগর , প্রেম সাগর লেক, শেখ হাসিনার ধরলা সেতু, ধরলানদী ,নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ি ও বিলুপ্ত সিটমহল দাসিয়ারছড়া।

আদমশুমারি রিপোর্ট ২০০১, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো; ফুলবাড়ী উপজেলার সাংস্কৃতিক সমীক্ষা প্রতিবেদন ২০০৭ অনুযায়ী শিক্ষার হার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড় হার ৩৮.১১%; পুরুষ ৪৫.৪৪%, মহিলা ৩০.৭৪%।

জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উৎস কৃষি ৭৪.২৮%, অকৃষি শ্রমিক ৫.১৮%, শিল্প ০.২৫%, ব্যবসা ৯.৩১%, পরিবহণ ও যোগাযোগ ১.৭০%, চাকরি ৩.৮১%, নির্মাণ ০.৬৫%, ধর্মীয় সেবা ০.১৮%, রেন্ট অ্যান্ড রেমিটেন্স ০.১৭% এবং অন্যান্য ৪.৪৭%।

কৃষিভূমির মালিকানা ৫৭.৯৫%, ভূমিহীন ৪২.০৫%, শহরে ৪৯.৫৭% এবং গ্রামে ৫৮.৬৬% পরিবারের কৃষিজমি রয়েছে।

জনসংখ্যা ১৪০৩৯২; পুরুষ ৭০৬২৭, মহিলা ৬৯৭৬৫, মুসলিম ১২৫০৩৩, হিন্দু ১৫২৪৫ এবং অন্যান্য ১১৪,ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মসজিদ ২৬১, মন্দির ১১।মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ পাকসেনাদের সঙ্গে লড়াইয়ে মুক্তিযোদ্ধা লুৎফর রহমান (ইপিআর) শহীদ হন।

১৯৮৩ সালের ২ জুলাই উপজেলা কার্যক্রম শুরু করে বর্তমানে নাওডাঙ্গা, শিমুলবাড়ী, ফুলবাড়ী সদর, বড়ভিটা, ভাঙ্গামোড় ও কাশিপুর এই ৬ টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ফুলবাড়ী উপজেলা।

নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন: ফুলবাড়ী উপজেলা থেকে সাত কিলোমিটার দূরে রয়েছে নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের অন্যতম দর্শনীয় স্থান নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ি ।

ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ‘বাহাদুর’ খেতাব প্রাপ্ত জমিদার প্রমদরঞ্জন বক্সী নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ি ও বংশের প্রতিষ্ঠাতা । জমিদার প্রমদরঞ্জন বক্সীর তিন ছেলে এবং এক মেয়ে ছিল। তার বড় ছেলে আইন ব্যবসা এবং ছোট ছেলে প্রকৌশলী হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেও তার মেজো ছেলে পড়ালেখায় ভীষণ কাঁচা ছিলেন। ফলস্বরূপ, জমিদারি সামলানোর দায়িত্ব তিনি মেজো ছেলেকেই দেন। মেজো ছেলে বিশ্বেশ্বর প্রসাদ বক্সী জমিদারি সামলাতে শুরু করেন। আর অন্যরা কর্মজীবন নিয়ে ব্যস্ততা ব্যস্ত থাকেন।

তাদের জমিদারী ছিল বর্তমান কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার বিদ্যাবাগীশ, শিমুলবাড়ী, তালুক শিমুলবাড়ী, কবিরমামুন সহ বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ।

এ ছাড়াও তাদের পাঙ্গা নামক এলাকায় আরেকটি জমিদারি ছিল, যা শিবপ্রসাদ নামে একজন দেখাশোনা করতো।

জমিদার বিশ্বেশ্বর প্রসাদ বক্সীর দুই ভাই ভারতের কুচবিহার রাজ্যে একটি বাড়ি ক্রয় করে সেখানে তাদের বাবা প্রমোরঞ্জন বকসী কে নিয়ে চলে গেলে, শেষ জমিদার বিশ্বেশ্বর প্রসাদ বক্সী জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত এখানে ছিলেন ।

জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে তিনিও ভাইদের কাছে চলে যান আর এভাবেই ইতি ঘটে জমিদার বংশের জমিদারি।
এখন জমিদারবাড়িতে গড়ে উঠেছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ। জমিদারির সময় শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণ জন্মতিথিতে দোল পূর্ণিমায় বাড়ির সামনে ফাঁকা মাঠে দোলের মেলা বসত, সে সময় বিভিন্ন এলাকা থেকে দোল সভারিরা পাহাড়ি সাজে সজ্জিত হয়ে সিংহাসন নিয়ে এই মেলায় অংশগ্রহণ করত‌, এ সময় ফুর্তিতে মেতে উঠত দোলযাত্রার মাঠ। প্রথা অনুযায়ী সেই দোলযাত্রা এখনো চলছে।

শিমুলবাড়ি ইউনিয়ন : ফুলবাড়ী উপজেলা থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শিমুলবাড়ী ইউনিয়ন। এ অঞ্চলে শিমুল গাছ বেশি থাকার কারণে এ অঞ্চলের নাম রাখা হয়েছে শিমুলবাড়ী।

শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের আকর্ষণ হলো ধরলা নদী। কারণ, এই নদীর উপরে নির্মিত হয়েছে ৯৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু যা শেখ হাসিনার ধরলা সেতু নামে নামকরণ করা হয়।

প্রতিবছর এ নদীতেই সনাতন ধর্মালম্বীদের গঙ্গার স্নান ও সেতুর পাশে বসতো দশহারার মেলা ।

বর্তমানে ফুলবাড়ী উপজেলার অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই সেতুটি। বিকেল গড়ালে দেখা মেলে মানুষের আনাগোনা। বিশেষ করে সরকারি ছুটি, বিভিন্ন দিবস ,ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এ সেতু হয়ে উঠে প্রাণবন্ত। সেতুটি মানুষে মানুষে ভরে যায়, দু’পাড়।

এ ছাড়াও বিভিন্ন জায়গা থেকে দর্শকরা ছুটে আসে প্রকৃতিকূ উপভোগ করতে। সেতুতে দাঁড়ালেই নজর কাড়ে চর অঞ্চল জুড়ে কাশবন, শরতের দিনগুলোতে কাশবন হয়ে ওঠে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। প্রকৃতির বৈচিত্রতা ও কাঁশফুলে সুব্রতায় এ মন জুড়িয়ে যায়।

ফুলবাড়ী সদর ইউনিয়ন : ফুলবাড়ী সদর ইউনিয়নকে ফুটিয়ে তোলে ফুলবাড়ী সদর ইউনিয়নে প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত মনমুগ্ধকর ফুল সাগর লেক ও প্রেম সাগরের লেক। লেকের পানি ও দু-পাড় দেখলে মন জুড়িয়ে যায়।

ভোরের আকাশে সূর্য উদিত হওয়া ও সূর্য অস্তে যাওয়া দৃশ্য মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের। এ অঞ্চলকে প্রাণের বন্ধন করেছে বেশ কিছু পুরনো সংস্কৃতি। প্রতিবছর আয়োজন হয় ঐতিহ্যবাহী ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতা ও লাঠি খেলা। শহর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে রয়েছে ৫০০ বছর পুরোনো স্মৃতিসৌধ আকৃতির শিমুল গাছ।

৪ শতাংশ জমিতে জুড়ে রয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী শিমুল গাছটি। বিভিন্ন জায়গা থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে আসে শিমুল গাছ টি দেখতে আসে। ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষ পালিত হচ্ছে এই গাছটির নিচে।

বড়ভিটা ইউনিয়ন : ধারণা করা হয় এখানে বড় বড় বসতভিটা ছিল যার কারণে এর নামকরণ করা হয় বড়ভিটা। এই এলাকার তেমন কোন ঐতিহ্য না থাকলেও বাঁশ উৎপাদনের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে এই অঞ্চল। শিক্ষা-দীক্ষার দিক থেকে ও বেশি পরিপাটি। এ অঞ্চলে দুই ধরনের বাঁশ লক্ষ্য করা যায়।

গ্রামীণ অর্থনীতি বিরাট ভূমিকা রেখেছে এই বাঁশ। বর্তমানে এ বাঁশ নিজ উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। এই ইউনিয়নে ধরলা নদীর একটি শাখা প্রবাহিত হয়েছে। প্রতি বর্ষা মৌসুমে এই নালাটি প্রাণ ফিরে পায়। এই নালায় আয়োজন করা হয় মজার নৌকা বাইচ। লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় এই নালার দু’পার। হৈ হুল্লোড় আর আনন্দে মেতে ওঠে চারপাশ।

ভাঙ্গামোর ইউনিয়ন : ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নটি ধললা ভাঙ্গনে কবলিত থাকার কারণে এর নামকরণ করা হয় ভাঙ্গামোড়। ভাঙ্গামোর ইউনিয়ন ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এই ইউনিয়নের কৃষক অত্যন্ত সৃজনশীল। এক দশক আগে কেউ ধারণা করেনি এখানকার মাটিতে পান উৎপাদন করা সম্ভব, কিন্তু কয়েকজন কৃষকের শ্রম ও তীব্র প্রচেষ্টায় এখন পানের চাষ হচ্ছে। এই পান নিজ জেলার গণ্ডি পার হয়ে চলে যাচ্ছে অন্যত্রে। এই পান চাষে অনেকেই আজ স্বাবলম্বী। পানের বরজের মুগ্ধকর পরিবেশ দেখলে মন ভরে যায়।

কাশিপুর ইউনিয়ন : ফুলবাড়ী উপজেলার অন্যতম হল কাশিপুর ইউনিয়ন, পূর্বে এ অঞ্চলে কাশফুল বেশি থাকার কারনে এর নাম করন করা হয়েছে কাশিপুর।

এ ইউনিয়নের শিক্ষার মান অনেক বেশি। এখানকার মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল। ধানের উৎপাদন তুলনামূলক খুবই ভালো। উপজেলা উৎপাদিত ধান উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।

দাসিয়ারছড়া উপজেলা সদর থেকে মাত্র চার কিলোমিটার পূর্বে রয়েছে বাংলাদেশের সর্ব বৃহত্তম বিলুপ্ত সিটমহল দাসিয়ার ছড়া। দাসিয়ারছড়া চারদিকে ঘিরে রয়েছে নীলকমল নদ।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত ভারতীয় ১১১টি ও ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ১৫১ টি ছিটমহল বিনিময় সংগ্রাম পরিচালিত হয় এখান থেকেই। যার ফলে দুই দেশে ১৬২টি সাবেক ছিটমহলের মানুষ বিনা রক্তপাতে স্বাধীনতা অর্জন করে।
পৃথিবীর বুকে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ।

এ অঞ্চলে মানুষের প্রতি রয়েছে খেলাধূলা ও সংস্কৃতির প্রতি ঝোঁক ।

ক্রিকেট-ফুটবল হাডুডুসহ বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন অঞ্চলকে প্রাণবন্ত করে রাখে। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী হাডুডু খেলায় পারদর্শীকতার পরিচয় বহন করে এই অঞ্চলের বেশকিছু খেলোয়ার তারা নিজে এলাকা ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খেলাধূলা করে থাকেন।