রবিউল হাসান রবি, চট্টগ্রাম ব্যুরো : অবশেষে ৯ মাসের শিশুসহ মুক্তি পেয়েছেন রোহিঙ্গা যুবকের বৈবাহিক প্রতারণার শিকার রাঙ্গুনিয়ার সেই সিরাজ খাতুন (৩৩)। মঙ্গলবার ২৯ জুন সকাল ১১টার দিকে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। এ সময় মানবাধিকার আইনজীবী এডভোকেট এ এম জিয়া হাবীব আহসানসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গা যুবকের বৈবাহিক প্রতারণার শিকার হয়ে গত ২৬ দিন দুগ্ধপোষ্য ৯ মাসের শিশু নিয়ে কারাবন্দি ছিলেন সিরাজ খাতুন। গত ২০ জুন তার জামিনের শর্ত পরিবর্তন করে স্থানীয় সংসদ সদস্য, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের স্থলে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা স্বজন কুমার তালুকদারের জিম্মায় জামিননামা দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহনাজ রহমান।

ওই জামিননামায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বার স্বাক্ষর করলেও আদালতের আদেশ দেখা ছাড়া স্বাক্ষর করতে রাজি ছিলেন না উপজেলা চেয়ারম্যান স্বজন কুমার তালুকদার। অবশেষে গত মঙ্গলবার আদালতের আদেশের কপি দেখে স্বাক্ষর করেন উপজেলা চেয়ারম্যান। ফলে জামিন প্রাপ্ত অসহায় নারী সিরাজ খাতুন ও তার শিশু সন্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন আজ।

এর আগে গত ১৬ জুন সিরাজ খাতুনকে জামিন দেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ৬ষ্ঠ আদালতের বিচারক মেহনাজ রহমান। মামলায় অভিযুক্ত মা ও শিশুকে বিনা খরচে আইনি সহায়তা দিচ্ছে মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইট ফাউন্ডেশন বিএইচআরএফ।

জানা গেছে, ১০ বছর আগে ভালোবেসে রোহিঙ্গা যুবক সিদ্দিকের সাথে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন সিরাজ খাতুন। কিন্তু যখন স্বামীর আসল পরিচয় জানতে পারেন, ততদিনে পানি গড়িয়েছে অনেক দূর। পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন নানা জায়গায়। একপর্যায়ে ঠাঁই হয় কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। স্বামী নিরুদ্দেশ হয়ে পড়লে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে সিরাজ খাতুন ছুটে আসেন গ্রামের বাড়ি রাঙ্গুনিয়ার পদুয়ায়। রোহিঙ্গা যুবকের প্রতারণার খবর শুনে হতবাক সিরাজ খাতুনের পরিবার।

এরপর জীবিকার তাগিদে সন্তানসহ সিরাজ খাতুনকে ওমান পাঠিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে তার পরিবার। পাসপোর্ট বানাতে গত ৩ জুন যান চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানাধীন মনসুরাবাদ অফিসে। পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের হাতে ধরা পড়েন সিরাজ খাতুন। মিল ছিল না নামের। তার ফিঙ্গার প্রিন্টে দেখা যায়, তিনি একজন “রোহিঙ্গা”। গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান সিরাজ খাতুন।

আদালত সূত্র জানায়, ১০ বছর আগে রাঙ্গুনিয়ার উত্তর পদুয়া এলাকায় একটি মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে কর্মরত ছিলেন রোহিঙ্গা যুবক সিদ্দিকী। পাশাপাশি অন্যের ফসলি জমিতে কাজ করতেন তিনি। এক সময় সিরাজ খাতুনের সাথে পরিচয় হয় তার। প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তারা। পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেন। নানা জায়গায় ঘুরেও যেন স্থির হতে পারছিলেন না তারা। একপর্যায়ে আটক হন পুলিশের কাছে। পুলিশ তাদের পাঠিয়ে দেয় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে।

সেখানে নতুন করে পথচলা শুরু করেন দুজনে। এর মধ্যে ত্রাণের আশায় সিরাজ খাতুনকে রোহিঙ্গা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। পালিয়ে বিয়ে করার পরপরই সিরাজ খাতুন জানতে পারেন তার স্বামী একজন রোহিঙ্গা। কিন্তু তখন তার আর কিছু করার ছিল না। ২০১৮ সালে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে যায় সিদ্দীক। এরপর থেকে সিরাজ খাতুন তার ২ সন্তানকে নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অসহায় হয়ে পড়েন। বাধ্য হয়ে তাকে ছুটে আসতে হয় রাঙ্গুনিয়ার উত্তর পদুয়ার সেই গ্রামে। জানা গেছে, সিরাজ খাতুনের প্রকৃত বাড়ি রাঙ্গুনিয়ার উত্তর পদুয়া এলাকার পূর্ব খুরুশিয়া গ্রামে। বাবার নাম মৃত নূর আলম।