খোলাবার্তা২৪ ডেস্ক : একটি ল্যান্ড ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন আলমগীর হোসেন। করোনা মহামারিতে তার চাকরি গেছে। লজ্জায় বাড়িও যেতে পারেন না। এ অবস্থা অনেকেরই৷

সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে আলমগীর বললেন, ‘‘আমি চাকরি করি, এলাকার লোকজন জানে৷ গত বছরও কোরবানি দিয়েছি৷ একটু পরেই সেমাই কিনতে হবে, এবার সেই পয়সাটাও নেই৷ কোরবানি দেবো কিভাবে? লজ্জায় বাড়ি যেতে পারি না৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে এখন পথে পথে ঘুরছি৷ কারো কাছে হাতও পাততে পারি না৷ কষ্টের কথা কাকে বলবো? আপনি শুনে হয়ত লিখবেন, তাতে আমার কী লাভ হবে? আমার তো জীবন চলছে না৷ এর মধ্যে আবার ১৪ দিনের লকডাউন আসছে, কীভাবে চলবো জানি না৷’’

একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন সাজেদুল ইসলাম মিলন৷ করোনা মহামারি শুরুর পর বেতনের ১৫ শতাংশ কমিয়ে দেয়া হয়েছে৷ গত বছর ঈদে পুরো বোনাস পেলেও এবার বোনাসের প্রায় ৪০ ভাগ কম পেয়েছেন৷ তার পক্ষেও এবার আর কোরবানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না৷ ডয়চে ভেলেকে মিলন বলেন, “আমার তো তা-ও চাকরি আছে৷ ৪০ ভাগ কমিয়ে দিলেও বোনাস তো পেয়েছি৷ কিন্তু যাদের চাকরি চলে গেছে, তারা কিভাবে চলছে, একবার চিন্তা করে দেখেন৷ আমরা আসলেই খুব কষ্টের মধ্যে দিন পার করছি৷ কিন্তু সেই কথাগুলোও কাউকে বলতে পারছি না৷”

শুধু আলমগীর হোসেন বা সাজেদুল ইসলাম মিলন নয়, এমন অসংখ্য মানুষ এবার ঈদে কোরবানি দিতে পারছেন না৷ কেউ আগে একাই একটা গরু কোরবানি দিলেও এবার হয়ত ভাগে দিচ্ছেন৷ যারা সরকারি চাকরি করেন, তারা ঠিকমতো বেতন-বোনাস পেয়েছেন৷ কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খুবই খারাপ৷ বড় একটা শ্রেনি তাদের কষ্টের কথা কাউকে বলতেও পারছে না৷ লজ্জায় এলাকায় যেতে পারছে না৷ ঢাকায় বাসা ভাড়া দিয়ে থাকার মতো অবস্থাও নেই অনেকের৷

বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে পড়েছে করোনার প্রভাব৷ ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘‘সব মিলিয়ে ১০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে পুরো বেনাস দিয়েছে৷ আর আংশিক ধরলে এটা ৩০ শতাংশ হবে৷ এ তো বললাম বোনাসের কথা৷ বেতনের অবস্থা আরো খারাপ৷ খুবই নামকরা প্রতিষ্ঠান, মালিকরাও অভিজাত-ধণাঢ্য, সেই সব প্রতিষ্ঠানেও কয়েক মাসের বেতন বাকি পড়েছে৷ বহু টেলিভিশন বেতন দেয়নি, বোনাসও দেয়নি৷ আজ দু-একটি প্রতিষ্ঠানে বোনাস দেওয়ার কথা৷ আমরা তথ্যমন্ত্রীকে এই বিষয়গুলো জানিয়েছি৷ তিনি কিছু উদ্যোগও নিয়েছেন৷ কিন্তু ভবিষ্যৎ ভালো দেখছি না৷’’

কুদ্দুস আফ্রাদ আক্ষেপ করে বলেন, ‘‘সাংবাদিকরা এই মহামারিতে সামনে থেকে কাজ করেছে৷ তারা মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা বলেন, লেখেন৷ অথচ এই সাংবাদিকরাই যে কতটা কষ্টে আছেন সেটা আপনাকে আমি বলে বোঝাতে পারবো না৷”

গার্মেন্টস সেক্টরের অবস্থা দৃশ্যত গত বছরের তুলনায় ভালো৷ বিজিএমইএ’র তালিকাভুক্ত সব প্রতিষ্ঠানেই বেতন ও বোনাস ঠিকমতো হয়েছে- এমন দাবি করে ডয়চে ভেলেকে এমন কথাই বলেছেন সংগঠনটির সভাপতি ফারুক হাসান৷ শ্রমিক নেত্রী বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তারও সেটা স্বীকার করলেন৷

তিনি বলেন, “এবার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই বেতন-বোনাস হয়েছে৷ সরকারও আগে থেকে তৎপর ছিল৷ আমরাও তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করেছি৷ ফলে কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া তেমন কোনো সমস্যা হয়নি৷ শুধু গাজীপুরে একটু সমস্যা হয়েছে৷”

তবে মালিবাগের আল মুসলিম গার্মেন্টসের শ্রমিক সালমা আক্তার মিম জানালেন, ‘‘কমপ্লায়েন্স কারখানায় বেতন ও বোনাস হলেও ছোট ছোট অনেক প্রতিষ্ঠানেই ঠিকমতো জুন মাসের বেতনই দেয়নি৷ কারো হয়ত ১০ হাজার টাকা বেতন, তাকে ৭ হাজার টাকা দিয়েছে৷ আর এসব শ্রমিকের বোনাস তো দেড়-দু’হাজার টাকা৷ আমার সঙ্গে থাকে এমন অনেকের খবরই আমি জানি৷ আমার প্রতিষ্ঠানে বেতন-বোনাস সবই দিয়েছে৷ এমনকি জুলাই মাসের ১০ দিনের বেতনও দিয়েছে৷ তবে কয়েকটি মেশিন নিয়ে প্রতিষ্ঠান চালায়- এমন জায়গাগুলোতে শ্রমিকরা অনেক কষ্টে আছেন৷”

রপ্তানিমুখি প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান রাশেদুল করিম মুন্না ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘যে যা-ই বলুক না কেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই অন্তত ২৫ ভাগ কর্মীকে ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে৷ আমি হয়ত নিজ তাগিয়ে অফিস বন্ধ থাকার পরও সব কর্মীকে পুরো বেতন ও বোনাস দিয়েছি, কিন্তু বহু প্রতিষ্ঠানের এই সক্ষমতা নেই৷ গত বছর আমাদের অর্ডার কিছুটা কম থাকলেও এবার কিন্তু অর্ডার ভালো৷ প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি উৎপাদনে ছিল৷ এবার লকডাউনে হয়ত ১৪ দিন বন্ধ থাকবে৷ আমাদের হাতে কাজ আছে৷ ঠিক মতো কাজ করতে পারলে তো কর্মীদের বেতন-বোনাসে সমস্যা হওয়ার কথা না৷’’

জানা যায়, সরকারি প্রতিষ্ঠানের বাইরে বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেতন ও বোনাস ঠিকমতো হয়েছে৷ অধিকাংশ ব্যাংকের কর্মীরাও নির্দিষ্ট সময়ে বেতন-বোনাস পেয়েছেন৷ তবে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরি করা কর্মীরা বিপদে পড়েছেন৷ চাকরি থাকলেও বেতন কমে গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানে নামমাত্র বোনাস দিয়েছে৷

একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা রুবিনা আক্তার বলেন, ‘‘এই মহামারির মধ্যেও আমরা ঠিকভাবেই বেতন ও বোনাস পেয়েছি৷ আমার স্বামীও একটি একটি ব্যাংকে চাকরি করেন৷ কিন্তু আশপাশের মানুষগুলো এতটাই খারাপ অবস্থায় আছে, সেটা দেখে কোরবানি দেওয়ার ইচ্ছাটাই নষ্ট হয়ে গেছে৷ তাই এবার আমরা পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কোরবানির টাকা দিয়ে গরিব মানুষকে খাবার কিনে দেবো৷ তবে এটা তো সমাধান না৷ মানুষ কাজ করতে চায়৷ কীভাবে তাদের কাজে নিয়ে আসা যায় সেই চেষ্টাই করা দরকার৷” – তথ্যসূত্র: ডয়চে ভেলে