হুমায়ুন কবির জুশান, কক্সবাজার : মানবতার শহর কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যৌনবাহিত রোগ এইচআইভি ভাইরাস প্রকোপ দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে। রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে এ রোগ। ক্যাম্পে স্থানীয় ও দেশি-বিদেশি হাজার হাজার এনজিও কর্মী কাজ করছেন। তাদের সাথে রোহিঙ্গাদের সখ্যতা, মেলামেশা, স্বাস্থ্যজ্ঞান ও অসচেতনতার ফলে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা কক্সবাজারে বৃদ্দি পাচ্ছে বলে জানা গেছে।

কক্সবাজার সদর হাসপাতাল থেকে যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত রোহিঙ্গার সংখ্যা বেশি। ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট এইডস আক্রান্ত হয়েছে ৯৮৮ জন। তারমধ্যে ৭৯৫ জন রোহিঙ্গা এবং ১৯৩ জন স্থানীয় বাসিন্দা।

আক্রান্তদের মধ্যে নারী ৫০৪ জন, পুরুষ ৩৬৮ জন, শিশু কন্যা ৫৮ জন এবং শিশু পুত্র্র ৫৫ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ৩ জন রয়েছে তৃতীয় লিঙ্গের। আক্রান্ত নারীদের মাঝে ১০০ জন গর্ভবতী বলে জানা গেছে।

এ পর্যন্ত এইডসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১১৬ জন। এর মধ্যে রোহিঙ্গা ৫৯ জন এবং স্থানীয় ৫৭ জন। গত মাসেই মারা গেছে ২ জন স্থানীয়।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের শফিকুর রহমান (ছদ্ননাম) ১ বছর আগে এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত হন। ১ বছর পরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে গেল সপ্তাহে পরীক্ষা করতে আসেন। পরীক্ষায় ধরা পরে সে এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত। তার ঘরে ৩ মেয়ে ২ ছেলে সন্তান রয়েছে। তাদেরকেও পরীক্ষা করাতে চান তিনি।

তিনি বলেন, আমি এর আগে কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে পরীক্ষা করেছি। সেখানেও রিপোর্ট পজেটিভ। আরেক রোহিঙ্গা পিতা তার ৪ বছরের শিশু কন্যাকে নিয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে এসেছেন এইচআইভি পরীক্ষা করাতে। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ল্যাব থেকে জানানো হয় তার শরীরে পাওয়া গেছে এইডসের জীবাণু।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের ল্যাবে প্রতিদিন বাড়ছে মানুষের সংখ্যা। গত ১ বছরে ১৩৪২ জন ব্যক্তির শরীর থেকে এইডসের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর এইডস আক্রান্তের হার বেশি। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আরএমও ডাক্তার মোঃ আশিকুর রহমান বলেন, বিশ্ব এখন রোহিঙ্গাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা সব সময় চেষ্টা করছি তাদেদর সুন্দর স্বাস্থ্য সুরক্ষার। রোহিঙ্গা আসার আগে তেমন এ রোগের প্রাদুর্ভাব ছিল না।

রোহিঙ্গাদের কাছে এইচআইভি রোগের প্রাদুর্ভাব থাকার কারণে ও তাদের অবাধ মেলামেশা এবং এক জায়গায় বেশি সংখ্যক জনবল হওয়ার কারণে এইচআইভি ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

এ রোগটি দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার কারণে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয়দের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ছে। গত বছরের ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত আমরা ১৩৪২টি টেস্ট করেছি। এরমধ্যে ১২৯ জনের প্রজেটিভ এসেছে। যেটা সংক্রমনের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে গত বছরের তুলনায়। সেক্ষেত্রে আশংকাজনক হারে সব চেয়ে বেশি রয়েছে রোহিঙ্গারা। ১২৯ জনের মধ্যে ১১৯ জনই রোহিঙ্গা এফডিএমএম। স্থানীয়দের মধ্যে আছেন ১০ জন।

গত বছর আক্রান্ত ১২৯ জনের মধ্যে ১৬ জন এইডসের কারণে মৃত্যু হয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের চিকিৎসা সমন্বয়ক ডাক্তার আবু তোহা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে বহুবিবাহের প্রচলন আছে। তাদের স্বাস্থ্যজ্ঞানও কম রয়েছে। এ রোগ তারা নিজেদের মধ্যে ছড়াচ্ছে বেশি। জুলাই মাসে এইডস আক্র্রান্ত হয়েছে ১৭ জন রোহিঙ্গা। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা ১১ জন। এদের মধ্যে গর্ভবতী নারী রয়েছেন ৩ জন। যারা আক্রান্ত হয়েছে তাদের আলাদা না করার কারণে এ রোগ আরো ব্যাপকভাবে ছড়ানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।