শরীয়তপুর প্রতিনিধি : বিরল এক মরনঘাতি রোগে আক্রান্ত হয়ে একর পর এক প্রতিবন্ধি হয়ে যাচ্ছে পরিবারের সকল সন্তানেরা। এমন একটি পরিবারের সন্ধান মিলেছে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার নাজিমপুর গ্রামে। এই পরিবারটির ৪ সন্তান একই রোগে আক্রান্ত হয়ে এ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের বাবাও মারা গেছেন অনে আগেই। এই হতদরিদ্র পরিবারটির সরকারের কাছে একটাই দাবী ঘর বা খাদ্য নয় সু-চিকিৎসার ব্যবস্থা হলেই সুস্থ্য হয়ে যাবে তারা।

স্থানীয় ও প্রতিবন্ধি পরিবার সুত্রে জানাগেছে, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার নাজিমপুর গ্রামের খলিল-রোকেয়া দম্পতির চার সন্তান। তাদের সন্তানেরা ১৮ থেকে ২০ বছর পার হওয়ার পর পর্যায় ক্রমে সবাই বিরল এক মরনঘাতি রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এদের মধ্যে আল-আমিন ছিলেন বড়। বিরল এই রোগে আক্রান্ত হয়ে গত ৮ বছর পূর্বে আল আমিনের মৃত্যু হয়েছে।

এখন এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে পরিবারের অন্যান্য সন্তান আলম (২৮), জহিরুল (২৬) ও তানজিলা (২২)। ২২ বছর পূর্বে পরিবারের কর্তা খলিলের মৃত্যু হলে সংসারের হাল ধরেন রোকেয়া। নিজেদের জায়গা জমিতে আবাদ করে ও প্রতিবেশীদের বাড়িতে কাজ করে সন্তানদের আগলে রেখেছিলেন তিনি। এখন বিরল এক মরনব্যাধির কাছে সন্তানদের পরাজয় মেনে নিয়েছেন মা রোকেয়া। চোখের সামনে সন্তানদের এমন দৃশ্য দেখে নিজেকে সামলাতে পারছে না রোকেয়া।

রোকেয়ার মেঝ ছেলে আলমের প্রাথমিক শিক্ষা শেষ না হতেই সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। এক পর্যায়ে সে ঢাকায় গিয়ে মটর গ্যারেজে কাজ শিখে আরব আমিরাতে চলে যায়। আলম সেখানে বিরল রোগে আক্রান্ত হয়ে ৮ মাসের মাথায় দেশে ফিরে আসে। সেই থেকে ৮ বছর ধরে ঘরের একটি কক্ষে অবস্থান করছে আলম। অন্যের সাহায্য ছাড়া ঘরের বাইরে যেতে পারে না সে। পায়খানা প্রসাবে একাকার হয়ে জানালা দিয়ে বাহির পানে তাকিয়ে থাকে সে।

বংশ রক্ষার আশায় ছোট ছেলে জহিরুলকে অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে করান মা রোকেয়া বেগম। এখন জহিরুল একটি সন্তানের জনক। সন্তান জন্মের পর থেকে বিরল এই রোগে ৬ বছর ঘরবন্দি জহিরুল।

তানজিলার বয়স এখন ২২। ৪ বছর পূর্বে প্রতিবেশী এক যুবকের সাথে তানজিলার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে তানজিলার অজানা বিরল রোগ দেখা দেয়। পরিস্থিতি টের পেয়ে স্বামী তানজিলাকে রেখে চলে যায়। এখন সে নিজে নিজে চলতে পারলেও শারীরিক অবস্থা ভালো না। যেকোন মূহুর্তে ভাইদের মতো অবস্থা হবে তার।

প্রতিবন্ধি আলম, জহিরুল ও তানজিলা জানায়, মা আমাদের পাশে রয়েছে। দিন শেষে এক বেলা খেয়ে হলেও বেঁচে আছি। জরাজীর্ণ ঘরে থেকে দিনাতিপাত করতেছি। এখন আমাদের পাঁকা ঘর বা খাবারের চাইতে চিকিৎসার প্রয়োজন বেশী। সঠিক চিকিৎসা পেলে আমরা হয়তো সুস্থ হয়ে যাবো। স্বাভাবিক ভাবে চলা ফেরা করতে পারবো। সমাজের বোঝা হয়ে থাকতে হতো না।

রোকেয়া বেগম বলেন, তানজিলাকে কোলে রেখে স্বামী মারা গেছে। অনেক কষ্ট করে সন্তানদের আগলে রেখেছি। কিন্তু সন্তানদের বয়স ২০ বছর পার হলেই একটি বিরল রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধি হয়ে যায়। বড় ছেলে এই রোগে অনেক দিন ভুগে ৮ বছর পূর্বে মারা গেছে। এখন ২ ছেলে ও ১ মেয়ে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। সামনে খাবার দিলে কোনরকমে মুখে দিতে পারে। অন্য কিছুই করতে পারে না।

পায়খানা প্রসাব করে একাকার হয়ে থাকে। দূর্গন্ধে কেই কাছে যেতে পারে না। আমিতো মা। সন্তানদের কোথায় ফালাবো। এখন গায়ে তেমন শক্তিও পাই না। তবুও সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব সন্তানদের পাশে থাকি। স্বামির রেখে যাওয়া জায়গা জমি বিক্রি করে সন্তানদের চিকিৎসার চেষ্টা করেছি। ছোট ছেলেকে পিজি হাসপাতালে রেখে ১ মাস চিকিৎসা করিয়েছি। টাকার অভাবে ভালো ভাবে চিকিৎসা করতে না পেরে চলে আসি। সহায়তা চেয়ে ফেসবুকে আবেদন করেছিলাম। জেলা প্রশাসক এসেছিলেন। সাথে অনেক অফিসার ছিলেন। একটা ঘর দিয়েছেন। ঘরের কাজ চলছে। এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী যদি আমার সন্তানদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন তাহলে হয়তো তারা সুস্থ হয়ে যেত।

ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাসান ইবনে আমিন বলেন, যখন স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে জানতে পারলাম নাজিমপুর এলাকায় একই পরিবারে তিনজন প্রতিবন্ধি রয়েছে। তখন মেডিকেল অফিসার পাঠিয়ে তাদের কাউন্সিলিং করি। আমাদের এ্যাম্বুলেন্সে তাদের ঢাকায় নিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষা করতে চেয়েছি। মেডিকেলের ভাষায় ধারণা করা হচ্ছে তাদের অটোজোনাল ডিজিজ বা মাসেল-নার্ভ দুর্বল সম্পর্কিত কোন রোগ হয়েছে। রোগ নির্নয় করে চিকিৎসা দেয়া গেলে হয়তো অনেকটা সুস্থা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জেলা প্রশাসক পারভেজ হাসান মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রাথমিক ভাবে তাদের গৃহের ব্যবস্থা করেছেন। প্রতিবন্ধিদের চিকিৎসার সুব্যবস্থাও করবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন জেলা প্রশাসক।