খোলাবার্তা২৪ ডেস্ক : ঈদের আগে সারা দেশের খুচরা বাজারে হঠাৎ করেই ভোজ্য তেলের সংকট দেখা দিয়েছে৷ ঢাকাসহ সারা দেশেই খুচরা দোকানগুলোয় উধাও সয়াবিন তেল।

ঢাকার পলাশী, হাতিরপুল, কলাবাগান, মিরপুর-১০, মিরপুর-১ ও মোহাম্মদপুরের বাজারগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোথাও সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না।

ঢাকার বাইরেও অনেক স্থানে সয়াবিন তেল পাওয়া যায়নি বলে জানা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও সয়াবিন তেল পাওয়া গেলেও দাম অনেক বেশি নেয়া হচ্ছে।

দিনাজপুরে বোতলজাত সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না, তবে পলিব্যাগে বা খুচরা বিক্রি হচ্ছে, তবে দাম অনেক চড়া।

বরগুনার পাথরঘাটা থেকে এক ভোক্তা মোহাম্মদ জামাল জানিয়েছেন, সেখানে ৭৬০ টাকা দামের পাঁচ লিটার তেলের বোতল বিক্রি করা হচ্ছে ১০০০ টাকায়। দিনাজপুরে বোতলজাত কোন সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না, তবে খোলা তেল বিক্রি হচ্ছে। আবার চট্টগ্রাম ও খুলনায় সয়াবিন তেল ক্রেতারা কিনতে পারছেন বলে জানা যাচ্ছে।

ঢাকার কয়েকটি বাজার ঘুরে না পেয়ে ঢাকার গুলশানের ডিসিসি মার্কেটে সয়াবিন তেল কিনতে এসেছেন আনোয়ার হোসেন নামের এক ক্রেতা। কিন্তু পুরো বাজার ঘুরে কোথাও সয়াবিন তেল পেলেন না। একজন বিক্রেতার সঙ্গে তাকে বলতে শোনা যায়, ”তোমাদের এত বড় বাজার, তার কোথাও সয়াবিন তেল নেই, এটা কেমন কথা?”

আনোয়ার হোসেন বলেন, ”আমার বাসা নিকেতনে। সেখানকার কোনো দোকানে সয়াবিন তেল নেই। তাই এখানে এলাম, কিন্তু এই বাজারেও নেই। সয়াবিন তেল নিয়ে আসলে হচ্ছে কী?”

শুধু তিনি একাই নন, বাজার ঘুরে সয়াবিন তেলের দেখা পাননি গ্রীনরোডের বাসিন্দা গৃহবধূ শাহানা পারভীনও। শনিবার থেকে মহল্লার কোনো দোকানে সয়াবিন তেল পাননি।

ঢাকার সুপারস্টোর বা অনলাইন শপগুলোতেও সয়াবিন তেল নেই।

রমজান শুরুর আগে দেশের বাজারে পাম অয়েল এবং সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে একটা সংকট তৈরি হয়েছিল। তখন সরকার হস্তক্ষেপ করে দাম নির্ধারণ করার পর সেই দফায় বাজার নিয়ন্ত্রণে আসে।

এখন আবার ঈদের আগ মুহূর্তে ভোজ্য তেল নিয়ে হাহাকার তৈরি হয়েছে।

মুসলমানদের বড় উৎসব ঈদুল ফিতরের উপলক্ষে আগের কয়েকদিন ভোজ্য তেলসহ অন্যান্য উপকরণের চাহিদা বেড়ে যায়। বাংলাদেশে জনপ্রিয় ভোজ্য তেল সয়াবিন তেল এবার সেখানে বড় ঘাটতির তৈরি করেছে।

দেশে ভোজ্য তেলের ৮০ শতাংশ আমদানি করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ভোজ্য তেল সয়াবিন। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অপরিশোধিত তেল আমদানি করে পরিশোধন করে বাজারে বিক্রি করে।

সয়াবিন তেল আমদানি, বিক্রি বা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা এই সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। তার মধ্যে কিছু রয়েছে বাণিজ্যিক, আর কিছুটা মজুদের প্রবণতাকে দায়ী করা হয়েছে।

খুচরা বিক্রেতার বলছেন, তারা ডিলার বা মিল থেকে পর্যাপ্ত সয়াবিন তেল পাচ্ছেন না। অন্যদিকে মিল মালিকদের দাবি, খুচরা বিক্রেতারা দাম বাড়ার আশায় মজুদ করে রাখছে।

বাংলাদেশের অন্যতম আমদানি কারক প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের পরিচালক (কর্পোরেট ও রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স) বিশ্বজিৎ বলেছেন, ”বিশ্ব বাজারে সয়াবিন তেলের দাম টন প্রতি ১৮৫০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু আমরা সরকারকে কথা দিয়েছিলাম, ঈদ পর্যন্ত প্রচলিত দামেই সাপোর্ট দিয়ে যাবো। সেটাই আমরা করছি। আমাদের মিল থেকে আমরা সয়াবিন বাজারে ছাড়ছি। কিন্তু হয়তো দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় খুচরা বিক্রেতারা সেটা মজুদ করে রাখতে পারেন।”

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন খুচরা বিক্রেতারা।

কাঁঠালবাগান এলাকার একজন বিক্রেতা সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ”আমরা তো তেলই পাচ্ছি না, বিক্রি করবো কোথা থেকে। ডিলারও পাচ্ছে না যে, বিক্রি করার জন্য দেবে।” সকাল থেকে অসংখ্য ক্রেতা তার দোকানে তেল খুঁজতে এসে ফেরত গেছেন বলে তিনি জানান।

তবে কাঁঠালবাগানেও খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কয়েকটি দোকানে সয়াবিন পাওয়া গেলেও তা দুইশো থেকে তিনশো টাকা বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।

এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন ‘এমভি ওরিয়েন্ট চ্যালেঞ্জ’ নামের একটি জাহাজ অপরিশোধিত সয়াবিন তেল নিয়ে বন্দরে এসেছে এবং সেখান থেকে খালাস প্রক্রিয়া চলছে৷

সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী জাহাজটিতে সিটি গ্রুপ, সেনা কল্যাণ এডিবল অয়েল, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল ও বসুন্ধরা গ্রুপসহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা তেল রয়েছে৷

চট্টগ্রাম বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক সয়াবিন তেল নিয়ে জাহাজ আসার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, “খালাসের প্রক্রিয়াও প্রায় শেষ পর্যায়ে৷”

বিদেশ থেকে আনা এই সয়াবিন তেল প্রথমে পতেঙ্গা ট্যাংক টার্মিনালে রাখা হয়৷ এরপর সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি তাদের কারখানায় নিয়ে গিয়ে সেখানে পরিশোধন করে বাজারজাত করে থাকে৷

সয়াবিন তেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বলেন, ‘‘বিশ্ববাজারে দাম বাড়তি, তাই আমদানি করা সয়াবিনের দামও বেশি দরে বাজারে বিক্রি করতে হবে। ঈদের পরে সরকার নতুন দাম ঠিক করে দিলে সে অনুযায়ী দাম ঠিক করা হবে৷’’

এদিকে ইন্দোনেশিয়া তাদের দেশ থেকে পাম তেল রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর বাংলাদেশেও পাম তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে৷