মোস্তাফিজুর রহমান : ভারতের দুই রাজ্যের পুলিশ লড়াই করছে। পুলিশের গুলিতে পুলিশ মারা যাচ্ছে। ভারতের জন্য ঘটনাটি অনভিপ্রেত। বিব্রতকরও বটে। তবে ঘটনার শুরু কিন্তু আজ নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস।

কিছুদিন আগে লাদাখে সীমান্ত নিয়ে লড়াই হয়েছিল ভারতীয় ও চীনের সেনার। তবে সেটা হলো দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে বিরোধ। ভারতের সঙ্গে চীনের, ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের এই বিরোধ আছে। সেটা দুই দেশের বিরোধ।

কিন্তু ভারতের মধ্যে দুই রাজ্যের পুলিশ একে অপরের বিরুদ্ধে লড়বে এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। যা এবার হলো আসাম ও মিজোরামের মধ্যে। আর আসামের ছয় জন পুলিশের মৃত্যু হলো এই ঘটনায়।

সীমানা নিয়ে ভারতের ভিতরে দুই রাজ্যের পুলিশের লড়াই ও মৃত্যুর ঘটনা সেই ১৯৮৫ সালের পর আবার হলো। তখন সীমানা নিয়ে বিরোধে জড়িয়েছিল উত্তর পূর্বের দুই রাজ্য আসাম ও নাগাল্যান্ড। বস্তুত আসামের সঙ্গে নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম এবং অরুণাচল প্রদেশের সীমানা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক ও বিরোধ আছে। এমনকী সেই বিরোধ অতীতে আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।

আসাম ও মিজোরামের মধ্যে বিরোধেরও একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে, সেই বিরোধ মূল থেকে না মিটিয়ে জোড়াতালি দিয়ে সাময়িকভাবে মেটানোরও ইতিহাস আছে। তার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে রাজনীতি, ভোট পাওয়ার অঙ্ক, কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের কোনো একটি রাজ্যে জনপ্রিয়তা না হারাবার প্রয়াস।

ভারতে একটা রাজ্য ভেঙে দু’টি রাজ্য হওয়ার অনেক উদাহরণ আছে। উত্তর প্রদেশ ভেঙে উত্তরাখÐ হয়েছে, মধ্যপ্রদেশ ভেঙে ছত্তিশগড় এবং বিহার ভেঙে ঝাড়খন্ড। এর অনেক আগে মহারাষ্ট্র ভেঙে গুজরাট ও গোয়া হয়েছিল। কিন্তু কোথাও সীমানা নিয়ে কোনো গোলমাল হয়নি।

ভারতে দুই রাজ্যের মধ্যে নদীর জলের বাটোয়ারা নিয়ে বিরোধ হয়েছে। দক্ষিণ ও উত্তর ভারতের একাধিক রাজ্য এই বিরোধে জড়িয়েছে। কিন্তু সেই বিরোধের জেরে দুই রাজ্যের পুলিশ নিজেদের মধ্যে লড়াই করছে এমনটা হয়নি। কিছুদিন আগে উত্তর প্রদেশ ও রাজস্থানের সীমানায় কৃষকদের আটকে দেয়া নিয়ে কিছুটা উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল দুই রাজ্যের মধ্যে।

করোনা নিয়ে লকডাউনের সময় পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সীমানা বন্ধ করে দেয় ওড়িশা। তাতে অনেকে পশ্চিমবঙ্গে ফিরতে পারছিলেন না। সেই সমস্যাও আলোচনা করে মিটে গিয়েছিল।

তাহলে উত্তর পূর্বের দুই রাজ্যের মধ্যে গোলমালটা এই জায়গায় গেল কেন? সেই প্রশ্নের জবাবে আসার আগে বিরোধের ইতিহসটা দেখে নিতে হবে। বিরোধ শুরু ব্রিটিশ আমলে। উনিশ শতকে বরাক ভ্যালিতে ব্রিটিশরা চা বাগান করে।

সেই বাগান সম্প্রসারণ করতে গিয়েই বিরোধ। ব্রিটিশদের বাধা দেয় মিজোরা। ১৮৭৫ সালে আসাম গেজেটে জেলার সীমানা নির্ধারণ করে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। মিজো উপজাতি প্রধানদের সঙ্গে কথা বলে কাছার ও লুসাই হিলসের সীমানা বেধে দেয়া হয়।

স্বাধীনতার পর আসাম ভেঙে একের পর এক রাজ্য গঠিত হয়। তখন আসাম ও মিজোরামের মধ্যে একটা সমঝোতা হয়, দুই রাজ্যের নো ম্যানস ল্যান্ডে কেউ কোনো নির্মাণ করবে না। কিন্তু ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে এমজেডপি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন কৃষকদের জন্য নো ম্যানস ল্যান্ডে একটি রেস্ট হাউস তৈরি করে। আসাম পুলিশ সেটা ভেঙে দেয়। ঝামেলা শুরু হয়।

আবার গত অক্টোবরে লায়লাপুরে একটি নির্মাণ নিয়ে বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। ওই এলকাটি মিজোরাম নিজেদের বলে দাবি করে। এবারও বিরোধের মূল কারণ, নো ম্যানস ল্যান্ডে নির্মাণ নিয়ে। আসাম বলছে, অরুণাচল জঙ্গল কেটে রস্তা বানাচ্ছে পুলিশের ক্যাম্প বসানোর জন্য। আর অরুণাচল দোষ দিচ্ছে আসামকে।

ঘটনা হলো, উত্তর পূর্বের রাজ্যগুলোর মধ্যে সীমানা নিয়ে বিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস সত্তে¡ও তা মেটাবার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে সেভাবে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

জোড়াতালি দিয়ে সমস্যা মেটানোর চেষ্টা হয়েছে। আসলে দু’টি রাজ্যের মধ্যে পানি বা সীমানা যে কারণেই কোনো বিরোধ হোক না কেন, কেন্দ্রীয় সরকার নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করে।

কারণ, তারা কোনো একটি রাজ্যের দিকে গেলে অন্য রাজ্যের মানুষ রেগে যাবে। আর এগুলো হলো আবেগের বিষয়। ফলে তার প্রভাব পড়বে ভোটে।

অন্ধ্রের মানুষের রায়কে উপেক্ষা করে রাজ্য ভাগ করার পর কংগ্রেস সেখান থেকে কার্যত মুছে গেছে। আগে যে রাজ্যে তারা সিংহভাগ আসনে জিতত, এখন সেখানে প্রায় সব কেন্দ্রেই তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।

তাই কেন্দ্রীয় সরকারের বরাবরের মনোভাব হলো, বিতর্কটা যত তাড়াতাড়ি পারা যায় ধামাচাপা দেয়া। আসাম-মিজোরাম বিরোধের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। গত জুনেও আসাম ও মিজোরামের মধ্যে সীমানা বিরোধ হয়েছিল।

দিন তিনেক আগে উত্তর পূর্বের সব মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সেখানে তিনি এই দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে বলেছেন, বিরোধ মিটিয়ে নিন। গত ২৮ জুলাইও মিজোরামের জোরামথাঙ্গা এবং আসামের হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে একই পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তার বেশি কিছু নয়।

দু’টি রাজ্যেই বিজেপি ক্ষমতায় আছে। মিজোরামে জোরামথাঙ্গার এমএনএফের সঙ্গে তাদের জোট। আসামে বিজেপি নিজেই ক্ষমতায়। এখন আসামের পক্ষ নিয়ে কিছু বললে মিজোরাম হাতের বাইরে চলে যাবে। তার প্রভাব পড়তে পারে উত্তর পূর্বের অন্য রাজ্যেও।

লোকসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রতিটি আসনের জন্য আলাদা পরিকল্পনা করেন মোদী-শাহ। তাই তারা এমন কিছু করবেন না, যাতে কোনো রাজ্যের মানুষ তাদের উপর ক্ষেপে যায়।

সমস্যাটা যে জায়গায় পৌঁছেছে, তাতে দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুধু নয়, রাজ্যের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে চলতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে। নো ম্যানস ল্যান্ডে কেউ যাতে কোনো কাঠামো না করে। এটা নিশ্চিত করতে হবে।

সীমানা নিয়ে যে বিরোধ রয়েছে, কমিশন করে সবদিক খতিয়ে দেখে তার সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। আসলে সমতলের রাজ্যের সীমানার সঙ্গে পাহাড়ের রাজ্যের সীমানা মেলে না।

পাহাড়ে সেই সীমানা অনেক সময়ই জঙ্গল বা খাড়া পাহাড়ি এলাকার মধ্যে পড়ে। যেখানে অন্য রাজ্যের জমির উপর দখলদারি করাটা সোজা। সেই সমস্যা আসামে-মিজোরাম নিয়েও হয়েছে।

এই বিরোধ এবার বাড়াবাড়ি জায়গায় চলে গেছে। আর মনে রাখতে হবে, উত্তর পূর্বের রাজ্যগুলোর অবস্থানগত গুরুত্ব অপরিসীম। চীন সীমান্ত কাছে। বাংলাদেশের সীমান্তও পাশে। ফলে অসম্ভব ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে এই এলাকার।

সেখানে দুই রাজ্যের পুলিশ এভাবে মারামারি করছে, গুলির বন্যা বয়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গে সামিল হচ্ছেন কিছু সাধারণ মানুষ, এই ছবিটা কাম্য তো নয়ই, একেবারেই অনভিপ্রত।

ভারতে এমনিতেই সমস্যার অন্ত নেই। তার উপর একটি রাজ্যের সঙ্গে অন্য রাজ্যের বিরোধ যদি এই জায়গায় পৌঁছে যায়, তা হলে তো পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তাই এটা মোদী-শাহের কাছেও চ্যালেঞ্জ।

রাজনৈতিক মুন্সিয়ানা দেখিয়ে এই বিতর্কের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান করাটা খুবই জরুরি।