শুক্রবার বাদ ফজর আ’ম বয়ানে শুরু বিশ্ব ইজতেমা

শেখ আজিজুল হক, গাজীপুর মহানগর : শুক্রবার বাদ ফজর পাকিস্থানের তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরব্বী মাওলানা জিয়াউল হকের আ’ম (ব্যাপক/সার্বিক) বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ৫৬তম বিশ্ব ইজতেমা। এর পর সকাল ১০টা থেকে শুরু হয় খুসুসি বয়ান (বিশেষায়িত বয়ান)। এ বয়ান একই সময়ে বিভিন্ন নির্ধারিত কামড়ায় বিভিন্ন শ্রেণীর উদ্দেশ্যে করা হয়।

শুক্রবার সকালে স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বয়ান করেন আলীগড়ের (ভারত) প্রফেসর সানাউল্লাহ সাহেব এবং স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বয়ান করেন পাকিস্থানের ড. নওশাদ সাহেব। একই সময় পৃথক কামড়ায় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উদ্দেশ্যে বয়ান করেন হায়দ্রাবাদের (ভারত) মাওলানা আকবর শরীফ এবং মধ্যপ্রাচ্য তথা আরবি ভাষাভাষীদের উদ্দেশ্যে বয়ান করেন ভারতের আল্লামা ইবরাহীম দেওলা। জুমার খুতবা ও বাদ আসর বয়ান করেন তাবলিগ জামাতের স্বাগতিক বাংলাদেশের শীর্ষ মুরব্বী কাকরাইল মারকাজ মসজিদের খতিব মাওলানা ক্বারী যোবায়ের হাসান এবং জুমার বয়ান করেন ভারতের মাওলানা ইসমাইল গোদরা। বাদ মাগরিব বয়ান করেন ভারতের মাওলানা আহমদ লাট। এসময় তার বয়ান তরজমা করেন মাওলানা ওমর ফারুক।

জুমার বয়ানে মাওলানা ইসমাইল গোদরা বলেন, দুনিয়ার জিন্দেগি ও দুঃখ কষ্ট সাময়িক। মৃত্যুর মাধ্যমে যার পরিসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু আখেরাতের জিন্দেগির কোনো পরিসমাপ্তি নেই। আখিরাতে কামিয়াব হওয়ার জন্য দুনিয়াতে সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। যিনি আখিরাতে সফলতা চান আল্লাহ তার জন্য সকল দরজা খুলে দেন। আল্লাহ তা’য়ালাকে রাজি খুশি করার জন্য যিনি মেহনত করেন আল্লাহ তার মেহনত নষ্ট করেন না। বরং তার জন্য হেদায়েতের সমস্ত রাস্তা খুলে দেন। আল্লাহ চান বান্দা তার রহমতের ভেতর চলে আসুক, বান্দাকে তিনি রহমতের বেষ্টনি দিয়ে রাখতে চান। বান্দার হিম্মত অনুযায়ী তাকে সামর্থ ও যোগ্যতা দান করেন। আমলের মাধ্যমে তার দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা এনে দেন। দুনিয়ার জিন্দেগিতে আল্লাহর হুকুম আহকাম নিজের জীবনের সাথে সেট করে নিতে হলে, কামিয়াবী জিন্দিগি গড়তে হলে অন্তত: চার চিল্লার (চল্লিশ দিনে এক চিল্লা) জন্য আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে হবে।

এদিকে অতীতের যে কোনো বছরের তুলনায় এবার বিশ্ব ইজতেমায় অধিক সংখ্যক মুসল্লির সমাবেশ ঘটেছে। তুরাগ নদের দুই পাড় (টঙ্গী ও উত্তরা) কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। মূল ময়দানে জায়গা না পেয়ে ফুটপাত, রাস্তাঘাট, অলিগলি, বিভিন্ন ভবনের ছাদসহ যে যেখানে একটু জায়গা পেয়েছেন সেখানেই সাবিয়ানা পেতে বসে পড়েছেন। মনোযোগ দিয়ে মুরব্বিদের বয়ান শুনছেন। শুক্রবার জুমার জামাতকে কেন্দ্র করে ইজতেমা ময়দান ও আশপাশের এলাকা বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

মূল ইজতেমা ময়দান ছেড়ে তুরাগ নদের পশ্চিম তীরে টঙ্গী-আশুলিয়া সড়কের পাশে স্থাপিত অস্থায়ী মিম্বার থেকে জুমার জামাতের ইমামতি করেন কাকরাইল মারকাজ মসজিদের খতিব মাওলানা ক্বারী যোবায়ের। তুরাগ নদে সেনাবাহিনী স্থাপিত ভাসমান ৫টি সেতুর মাধ্যমে পূর্বতীরে মূল ময়দানের মূল জামাতের সাথে নিবচ্ছিন্ন সংযোগ স্থাপন করা হয়। ভাসমান সেতুতে শত শত মুসল্লি জুমার জামাতে শরিক হয়ে দুই তীরের জামাতে সেতুবন্ধন তৈরি করেন।

মূল ময়দানে স্থান সংকুলান না হওয়ায় জুমার জামাত আশপাশের সড়ক ও মহাসড়ক ছাপিয়ে যায়। এবার অভূতপূর্ব মুসল্লির সমাগম হওয়ায় ইজতেমার জুমার জামাত মূল ময়দান ছাড়িয়ে আশপাশের বিভিন্ন স্থলে-জলে, সড়ক, মহাসড়কেও বিস্তৃতি লাভ করে। বেলা পৌনে ২টায় অনুষ্ঠিত হয় এ বৃহত্তর জুমার জামাত।

ইজতেমায় অংশগ্রহণকারী লাখ লাখ মুসল্লি ছাড়াও রাজধানীসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার হাজার হাজার মানুষ এই বৃহত্তম জুমার জামাতে শরিক হন। দুই বছর পর বিশ্বের অর্ধশতাধিক দেশের প্রায় ৪ হাজার ৩৬১ জন তাবলিগ অনুসারীসহ কয়েক লাখ মুসল্লির অংশগ্রহণে শুরু হয় এবারের বিশ্ব ইজতেমা। অনুক‚ল আবহাওয়া ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকায় ইজতেমায় আগত মুসল্লিগণ স্বাচ্ছন্দ্যে তাবলীগ জামাতের শীর্ষ মুরুব্বিদের বয়ান শুনছেন এবং ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল রয়েছেন।

আগামী রোববার দুপুরের আগে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে তাবলিগের আ’লমী শূরা আয়োজিত এবারের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম ধাপের সমাপ্তি ঘটবে। এর পর আগামী ২০ জানুয়ারি থেকে দ্বিতীয় ধাপে বিশ্ব ইজতেমার আয়োজনে থাকছেন মাওলানা সা’দ কান্দলভীপন্থীগণ।

এদিকে শুক্রবার সকাল থেকেই সর্বস্তরের মুসলমানরা জুমার জামাতে শামিল হওয়ার জন্য টুপি, পাঞ্জাবী পরে জায়নামাজ হাতে ইজতেমা ময়দানের দিকে ছুটতে থাকেন। দেশ বিদেশের অগণিত মুসল্লির সঙ্গে একই জামাতে শরীক হয়ে নামাজ আদায় করার মাধ্যমে অধিক সাওয়াব হাসিলের উদ্দেশে সবার মধ্যে দেখা গেছে ব্যাকুলতা। যতই সময় গড়াতে থাকে ততই মুসল্লিদের ঢল আঁচড়ে পড়ে তুরাগ তীরে। শিশু কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের সমাবেশ ঘটে জুমার জামাতে।

টঙ্গী, উত্তরা, কামারপাড়া, মিরপুর, আবদুল্লাহপুরসহ আশপাশের এলাকার মসজিদে শুক্রবারের জুমার জামাতে মুসল্লি সংখ্যা ছিল খুবই কম। ইজতেমা মাঠে জুমার জামাত সুবিশাল প্যান্ডেলের গন্ডি ছাড়িয়ে বিস্তৃতি লাভ করে চারপাশের অলি-গলি ও রাস্তায়।