খোলাবার্তা২৪ ডেস্ক : কালজয়ী একটি ফার্সি প্রবাদের গল্প: ‘শাহ দিলেও খান দেয় নি’। করিম খান জান্দ নামে ইরানি এক খান ছিলেন। তিনি রাজকোষের ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন।

জনগণের আমানত যেমন অপচয় করতেন না তেমনি বাদশাদের মতো দানবীর ছিলেন না। সে কারণে তাঁর আশপাশে যারা ছিলো তাদেরকে রাজকোষের অর্থ খামোখা দান করে দয়ালু সাজতেন না। কেননা রাজকোষের মালামাল ছিলো পুরো দেশের মানুষের আমানত। করিম খানের এক মন্ত্রী ছিলেন শেখ আলি খান নামে। তিনি নিজেও এ ব্যাপারে খুব সচেতন ছিলেন। বাদশার দরবার যাতে বেহুদা কোনো খরচ না হয় সেদিকে তিনিও লক্ষ্য রাখতেন।

সাধারণত যে কোনো বাদশার দরবারে সংগীত শিল্পী থাকতেন, কবিরা থাকতেন, থাকতেন ম্যজিশিয়ান বা যাদুকরেরাও। তারা বিনোদনের ব্যবস্থা করে বাদশাকে হাসিখুশি রাখতেন। কিন্তু করিম খান জান্দের দরবারে এদের কেউই ছিলেন না। কেবল এক কবি ছিলেন যিনি বাদশা জান্দকে মনেপ্রাণে ভালোবাসতেন, তিনিই দরবারে যাওয়া আসা করতেন। মাঝে সাজে এই কবি করিম খান জান্দের উপস্থিতিতে দরবারে যেতেন এবং তাঁকে কবিতা শোনাতেন। করিম খান অবশ্য কবিতা শোনানোর জন্য কবিকে কোনো টাকাপয়সা দিতেন না। এ কারণে কোনো কবিই বাদশার দরবারে যেতে উৎসাহ বোধ করতেন না। ওই কবি একদিন যথারীতি করিম খান জান্দকে কবিতা শোনালেন। এইদিন অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটে গেল।

কবির কবিতা শোনার পর বাদশাহ করিম খান জান্দ তাঁর মন্ত্রী শেখ আলি খানকে বললেন: ‘এই কবিকে এক হাজার সোনার কয়েন পুরস্কার হিসেবে দিয়ে দাও’। শেখ আলি খান এবং কবি দুজনেই বাদশার আদেশ শুনে থমকে গেলেন। করিম খান আজ পর্যন্ত কোনো কবিকে কবিতা শোনানোর জন্য কোনো টাকা পয়সা কিংবা কোনো পুরস্কার দেন নি। তবে কবি ভীষণ খুশি হয়ে গেলেন। কবিতা শুনিয়ে এক হাজার সোনার কয়েন পুরস্কার পেয়েছেন, খুশি না হয়ে পারেন! কবি তাঁর আসন থেকে উঠে বাদশার মন্ত্রী শেখ আলি খানের কাছে গিয়ে তাঁর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করতে গেলেন। কিন্তু শেখ আলি খান জানতেন না বাদশা কী মনে করে এই পুরস্কার দেওয়ার আদেশ দিলেন। সে জন্য শেখ আলি খান একটা অজুহাত তৈরি করার চেষ্টা করলেন। তিনি কবিকে বললেন: আমি এখন রাজকোষের হিসেব নিকেশ নিয়ে ব্যস্ত আছি। এখন যাও! পরে এসো!

কবি তার স্বভাব সুলভ সাদাসিধে ভঙ্গিতে বললো: ঠিক আছে। এই বলে কবি সেদিন দরবার থেকে চলে গেল। এক সপ্তাহ পর আবার এলো শেখ আলি খানের কাছে বাদশার দেওয়া পুরস্কার এক হাজার সোনার কয়েন গ্রহণ করতে। কিন্তু এদিনও শেখ আলি খান কবিকে কোনো কিছু দিলো না। অগত্যা কবি খালি হাতেই ফিরে গেলেন। এভাবে দীর্ঘদিন পর্যন্ত শেখ আলি খান কবিকে দেওয়া বাদশার পুরস্কারটা বুঝিয়ে দিলেন না। বাদশার মন্ত্রী শেখ আলি খান এভাবে রাজকোষের সম্পদ কাউকে দিয়ে দেওয়া উচিত বলে মনে করলেন না। সে কারণে শেখ ভাবলেন এভাবে বারবার ঘুরালে কবি এক সময় ক্লান্ত শ্রান্ত আর বিরক্ত হয়ে যাবে এবং পুরস্কারের অর্থ নিতে আর তার কাছে ধর্না দেবে না।

মন্ত্রীর ধারণা ঠিকই হলো। তবে কবিও নাছোড়বান্দা। তিনি করিম খান জান্দের দরবারে গিয়ে তাকে পুরস্কার না দেওয়ার কথাটা বাদশাকে জানিয়ে দিলেন। কবির কথা শুনে বাদশা তাঁর মন্ত্রী শেখ আলি খানকে ডেকে পাঠালেন। মন্ত্রীকে বাদশাহ বললেন: তুমি যে এভাবে কবিকে কষ্ট দিয়েছো, ঠিক করো নি। যাও কবিকে এখন এক হাজারের পরিবর্তে দুই হাজার সোনার কয়েন দাও!

শেখ আলি খান একেবারেই ভাবতে পারছিলেন না যে এরকম হিতে বিপরীত হবে। তিনি তো এক হাজার সোনার কয়েন দেওয়াটাকেই অনেক বেশি বলে মনে করেছেন। সুতরাং তিনি বাদশা করিম খান জান্দের আদেশকে খুব একটা গুরুত্ব দিলেন না।

তিনি বাদশাহর আদেশ শুনে কিছুই বললেন না তবে কবিকেও কিছুই দিলেন না। কবি আগের মতোই শেখ আলি খানের কাছে পুরস্কার নিতে বারবার গেলেন এবং বারবারই না পেয়ে ফিরে গেলেন। এই ঘটনা চলতেই থাকলো। কবির ভাগ্যেও কিছুই জুটলো না।

একদিন পুরস্কারের কয়েন নিতে এসে মন্ত্রীর কাছে কবি খুব হেস্তনেস্ত হলেন। কবির খুব রাগ হলো। একেবারে চীৎকার করে মন্ত্রীকে বলে উঠলো: ‘এসব কী হচ্ছে! বাদশা দান করলেন আর মন্ত্রী দানের কয়েন দিচ্ছেন না’! তুমি কেন শাহের দেওয়া পুরস্কার দিচ্ছো না আমাকে! আমার আহত জীবনের চিকিৎসা করতে?

কবির এই সোচ্চার দাবি বাদশাহ করিম খান জান্দের কানে গেল। বাদশাহ তার মন্ত্রী শেখ আলি খানকে ডেকে বললেন: আল্লাহর এই বান্দাকে তুমি বিরক্ত করছো কেন? কেন তাকে তার পুরস্কার বুঝিয়ে দিচ্ছো না?

শেখ আলি খান এবার কথা বলার সুযোগ পেয়ে গেলেন। বাদশাকে তিনি বললেন: আপনার জন্য আমার জান কোরবান বাদশাহ জনাব! আপনি তো অন্যান্য বাদশার মতো ছিলেন না। খামোখা রাজকোষের আমানতের অপচয় করতেন না। হঠাৎ এমন কী ঘটে গেল যে আপনি পাল্টে গেলেন!

বাদশাহ করিম খান জান্দ বললেন: এখনও আমি দেশের রাজকোষের অর্থ অপচয় করতে পছন্দ করি না।

বাদশাহ আরও বললেন: আমি চাই না ওই আমানতের খেয়ানত হোক। কিন্তু আমি জানি এই কবির না ঘর আছে না জীবন জীবিকা আছে। সেজন্য আমি চাচ্ছি রাজকোষের অলস অর্থ থেকে এই কবিকে কিছু দেবো। ওই অর্থ দিয়ে সে তার ঘরবাড়ি বানাবে। জীবন সাজাবে। আর ঘর বানাতে অনেক লোককে কাজে লাগাবে। তাদেরও জীবন জীবিকার ব্যবস্থা হবে এই অর্থ দিয়ে। এ কাজের মাধ্যমে রাজকোষের অলস অর্থ চক্রাকারে ঘুরবে। এরপর কবিকে ডেকে বললেন: আপনার পুরস্কারের পরিমাণ পাঁচ গুণ বেড়ে গেছে। যান, শেখ আলি খানের কাছ থেকে আপনার পুরস্কারের পাঁচ হাজার সোনার কয়েন বুঝে নেন।

কবি বাদশার কথামতো মন্ত্রী শেখ আলি খানের কাছে গেল পুরস্কারের অর্থ বুঝে নিতে। শেখ আলি খান এবার আর আগের মতো কবিকে ঘুরালেন না। তাঁর পুরস্কারের পাঁচ হাজার সোনার কয়েন তাঁকে সসম্মানে বুঝিয়ে দিলেন। এই ঘটনার পর থেকে যখনই কোনো অধীনস্ত কর্মকর্তা উর্ধ্বতনদের দেওয়া পুরস্কার বা দানের অর্থ বুঝিয়ে দিতে গড়িমসি করতো বলে উঠতো: ‘শাহ দিয়েছে অথচ শেখ আলি খান দেয় নি’।